বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

৫০ শয্যার ভবন, চলছে ৩১ শয্যার জনবলে—বাগাতিপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা সংকট

নাটোর প্রতিনিধি ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নাটোর প্রতিনিধি ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪৫ অপরাহ্ন
৫০ শয্যার ভবন, চলছে ৩১ শয্যার জনবলে—বাগাতিপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা সংকট

৫০ শয্যার অবকাঠামো থাকলেও ৩১ শয্যার জনবল ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে চলছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রায় দেড় লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল সরকারি এই হাসপাতালে এক্স-রে বন্ধ রয়েছে দেড় মাস ধরে। প্যাথলজি বিভাগেও নেই প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও পর্যাপ্ত জনবল। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় দুর্ভোগে পড়ছেন ভর্তি রোগীরা।


সরেজমিনে বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ফিল্ম সংকটের কারণে প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে এক্স-রে পরীক্ষা। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করাতে আসা রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা অন্যত্র যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে।


সরেজমিনে হাসপাতালের এক্স-রে কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষে তালা ঝুলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে এক্স-রে ফিল্মের বরাদ্দ না থাকায় পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।


প্যাথলজিতেও জনবল ও কেমিক্যাল সংকট

হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগেও রয়েছে নানা সংকট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী প্যাথলজি বিভাগে মাত্র দুজন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। রোগীদের রক্ত, প্রস্রাবসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ, রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট প্রস্তুতের কাজ তাদেরই করতে হচ্ছে।


তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কেমিক্যালেরও সংকট রয়েছে।


জেনারেটর আছে, নেই জ্বালানি

হাসপাতালের নতুন ভবনের সিঁড়ির নিচে একটি নতুন জেনারেটর দেখা গেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, পরীক্ষামূলকভাবে একদিন জেনারেটরটি চালু করা হয়েছিল। এরপর জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় সেটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় তীব্র গরমে ভর্তি রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


রাস্তায় জমে থাকে নোংরা পানি

নতুন ভবনের প্রবেশপথের বাম পাশে ইটের দেয়াল ঘেঁষে টয়লেটের নোংরা পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি রোগী, স্বজন ও কর্মীদের চলাচলে ভোগান্তি হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী সমাধান করা যাচ্ছে না।


অ্যাম্বুলেন্স আছে, চালকের সংকট

হাসপাতালের পশ্চিম পাশে গ্যারেজে দুটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই অ্যাম্বুলেন্স চালকের সংকট রয়েছে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সরকারি গাড়ির চালক রাকিব একই সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সও চালাচ্ছেন।


ফলে জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া এবং দ্রুত রোগী পরিবহন নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বাড়তি খরচে পরীক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরা

বাগাতিপাড়া ছাড়াও লালপুর, আড়ানীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধার সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা ব্যাহত হচ্ছে।


উপজেলার মাড়িয়া গ্রামের মনোয়ারা বেগম ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসক তাকে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিলেও প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে জানতে পারেন, সেখানে এ পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।


মনোয়ারা বেগম বলেন, “ডায়াবেটিসের মতো সাধারণ একটি পরীক্ষাও হাসপাতালে করা যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত টাকা খরচের পাশাপাশি অসুস্থ রোগীকে নিয়ে বারবার যাতায়াত করতে হচ্ছে।”


গালিমপুর গ্রামের তোসাদ্দেক সরকার বলেন, “চিকিৎসক রোগীকে এক্স-রে করিয়ে আনতে বলেন। পরে জানতে পারি, হাসপাতালে এক্স-রে হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ৪০০ টাকা খরচ করে এক্স-রে করাই। রিপোর্ট নিয়ে হাসপাতালে ফিরে আসতে দুপুর পার হয়ে যায়। এসে দেখি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক আর নেই। ফলে রোগীকে নিয়ে আবার পরদিন আসতে হবে।”


স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এসব সংকটের বিষয়ে জানতে বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত রেজওয়ানুল হকের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।


তবে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সমস্যাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে। তবে এক্স-রে ফিল্মসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সরঞ্জাম অর্থবছরের শুরুতে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেনা হয়। এ প্রক্রিয়ার কারণে অর্থবছরের শুরুর দিকে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়। ইতোমধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”