বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

বদলগাছীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে কৃষক, তবু মিলছে না প্রয়োজনের সার

বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:১৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:১৩ অপরাহ্ন
বদলগাছীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে কৃষক, তবু মিলছে না প্রয়োজনের সার

আমন ধান রোপণের মৌসুমে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ব্যস্ত থাকার কথা নওগাঁর বদলগাছীর কৃষকদের। কিন্তু প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতেই দিনের বড় একটি সময় কাটছে তাঁদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সার বিক্রেতার দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।


কৃষকদের অভিযোগ, কোনো দোকানে ইউরিয়া পাওয়া গেলেও মিলছে না ডিএপি। আবার কোথাও ডিএপি থাকলেও নেই এমওপি। কোনো কোনো দোকানে চাহিদার তুলনায় কম সার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে এক ডিলারের দোকান থেকে আরেক ডিলারের দোকানে ছুটতে হচ্ছে তাঁদের।


রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বদলগাছী সদরের শাওন ট্রেডার্সের সামনে সার কিনতে আসা কৃষকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে এখন এমন দৃশ্য প্রায় নিয়মিত। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পেয়ে অনেককে ফিরে যেতে হচ্ছে।


সদর ইউনিয়নের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ও আব্দুল আলিম বলেন, “জমি প্রস্তুত করে ধান লাগাব, নাকি সারের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরব—এটাই এখন বুঝতে পারছি না।”


সার নিতে আসা কৃষক শমসের আলী ও মোস্তফা বলেন, মাঠে শ্রমিক দিয়ে ধান লাগানোর কাজ চলছে। তাঁদের এখন জমিতে থাকার কথা। কিন্তু সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে হতাশা, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ায় কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ছে।


উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বদলগাছীতে ১০টি বিসিআইসি ও ১৯টি বিএডিসি সার ডিলার রয়েছেন। উপজেলার আট ইউনিয়নের ৭২টি ওয়ার্ডে রয়েছে ৭২টি খুচরা সার বিক্রয়কেন্দ্র। চলতি বছর উপজেলায় ইউরিয়ার বার্ষিক চাহিদা ৬ হাজার ২৯০ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ৬১৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪ হাজার ১০০ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২ হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন।


চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া ৩১২ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৮৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৩৩৩ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৮০ মেট্রিক টন বরাদ্দ রয়েছে।


এত সংখ্যক ডিলার ও বিক্রয়কেন্দ্র থাকার পরও কৃষকদের কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। কৃষকদের অভিযোগ, সমস্যা শুধু সার না পাওয়ার নয়; একই সময়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সার না পাওয়ায় তাঁদের একাধিক দোকানে ছুটতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ দুটিই বাড়ছে।


স্থানীয় কৃষকদের কেউ কেউ কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। 


সদরের শাওন ট্রেডার্সের মালিক মো. শামসুল হক বলেন, “গতকাল ডিলারের কাছ থেকে ডিএপি ও এমওপি সার কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের চাহিদা বেশি ইউরিয়া সারের। এ কারণেই মূলত দীর্ঘ লাইন হয়েছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে বরাদ্দ পেলে এমন লাইন থাকত না।”


আলম ট্রেডার্সের মালিক মাসুদ করিমও দীর্ঘ লাইনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “গতকাল সারের জন্য দীর্ঘ লাইন ছিল। আজ সকাল থেকে ইউরিয়া সার দেওয়া হয়েছে। তবে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া গেলে কৃষকদের এ ভোগান্তি হতো না।”


বদলগাছী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মেহেদী হাসান বলেন, “সারের কোনো সংকট নেই। সদর ইউনিয়নে চলতি বছর ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। গতকাল সদর ইউনিয়নে সারের জন্য দীর্ঘ লাইন ছিল। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা নজরদারি করছি। আশা করছি, আগামীতে এ ধরনের দীর্ঘ লাইন থাকবে না।”


বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে সাপাহার উপজেলা থেকে অতিরিক্ত ৭০ মেট্রিক টন সার আনা হয়েছে। কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ডিলারের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সার বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


তবে মাঠের চিত্র বলছে, পর্যাপ্ত ডিলার ও বিক্রয়কেন্দ্র থাকার পরও প্রয়োজনের সময়ে কৃষককে সার পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ফলে বরাদ্দ, সরবরাহ ও বণ্টন ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন কৃষকেরা।#