বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: চমক দেখালেন বলসোনারো

সোনার দেশ ডেস্ক ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১০ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১০ অপরাহ্ন
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: চমক দেখালেন বলসোনারো
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: চমক দেখালেন বলসোনারো

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটে বর্তমান বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে সামান্য ব্যবধানে পেছনে ফেলে চমক দেখিয়েছেন ডানপন্থি সিনেটর ফাভিও বলসোনারো। এর ফলে আগামী মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যায় দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী।


রোববার (৪ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের ভোটের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, লুলার ৪৫ শতাংশ ভোটের বিপরীতে বলসোনারো পেয়েছেন ৪৭ শতাংশ ভোট। অথচ ভোটের আগের বেসরকারি জরিপগুলোতে লুলা প্রায় ৩ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে থাকবেন বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।


জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তাহীনতা এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল। এছাড়া লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্র ডানপন্থি দলগুলোর ধারাবাহিক জয়ের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। লুলার পুনঃনির্বাচন ওয়াশিংটনের জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। কারণ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে তার সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতবিরোধ রয়েছে।  

ভোটের ফলাফলে বলসোনারোর এই শক্তিশালী অবস্থান তার প্রচারণাকে যেমন চাঙা করেছে, তেমনি এটি ব্রাজিলের মুদ্রা ও শেয়ারবাজারকেও চাঙা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভোটের পর রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের বলসোনারো ‍উল্লাস প্রকাশ করে বলেন, “ব্রাজিল পরিবর্তন চায়।” এ সময় তিনি লুলার ‘ওয়ার্কার্স পার্টির’ যুগের অবসানের ঘোষণা দেন। 


উল্লেখ্য, ফাভিও বলসোনারো হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের দায়ে জাইর বলসোনারো বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। আগামী ২৫ অক্টোবর চূড়ান্ত ধাপের নির্বাচনে লুলার বিরুদ্ধে লড়বেন ফাভিও।


অপ্রত্যাশিত ফল

ইগারাপে ইনস্টিটিউট থিঙ্ক-ট্যাংকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মুগাহ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “জরিপ পরিচালনাকারীরা পুরোপুরি ভুল অনুমান করেছেন।” তিনি আরো বলেন, “আশা করা যায় দ্বিতীয় দফার জরিপগুলোতেও, যা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, বলসোনারোর প্রকৃত অবস্থানকে কম করে দেখানো হবে।”


রবিবার সকালে রিও ডি জেনিরোয় সাংবাদিকদের বলসোনারো বলেন, তিনি এমন মানুষের ‘বিক্ষোভ ভোটের’ ওপর ভরসা করছেন, যারা সাধারণত অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলেও লুলার ঘোর বিরোধী।


সাওপাওলোতে ভোট দিতে যাওয়ার সময় ৪১ বছর বয়সী আইনজীবী থাইসে লিমা রয়টার্সকে বলেন, তার মূল লক্ষ্য লুলার ওয়ার্কার্স পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরানো। 

তিনি বলেন, “আমরা মনে হয় না বলসোনারো সেরা প্রার্থী, তবে আমি সম্ভবত পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারি।”


ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট ৪৯ বছর বয়সী ফার্নান্দো টেম্পেল রয়টার্সকে জানান, মিনাস গেরাইস রাজ্যের সাবেক গভর্নর রোমেউ জেমাকে প্রাথমিকভাবে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত বলসোনারোকেই ভোট দিচ্ছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাফায়েল ফাভেত্তি বলেন, “এই প্রতিবাদী ভোটই বলে দিচ্ছে দ্বিতীয় ধাপে কী হতে চলেছে।” তিনি আরো বলেন, “যদিও এটি এখন বলসোনারোর জন্য ‍সুবিধাজনক হবে, তবে দ্বিতীয় ধাপে তার ভোট বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে যাবে, কারণ সেই সমর্থনগুলো আগেই চলে এসেছে।” 


ব্রাজিলের বৈষম্য ও বেকারত্ব হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, ভারী পারিবারিক ঋণ এবং অপরাধ ও গ্যাং কার্যকলাপের হুমকির মুখে থাকা ভোটারদের মন জয় করতে লুলা হিমশিম খেয়েছেন। 

বলসোনারো জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোকে পুঁজি করার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে লুলা অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং নির্বাচনের লড়াই তীব্র হওয়ার সাথে সাথে সামাজিক কল্যাণ ভাতা বাড়িয়েছেন ও পরিবারগুলোর জন্য নতুন ঋণ মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছেন।  


জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান উচ্চ ব্যয় এবং জিডিপির ৮২ শতাংশের বেশি সরকারি ঋণের কারণে দেশটির আর্থিক খাত নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সরকার চলতি ও আগামী বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে যথাক্রমে ২.০ ও ২.৩ শতাংশ করেছে।     

  

ব্রাসিলিয়ার ৫২ বছর বয়সী সরকারি চাকরিজীবী মার্সিয়ানো দে সুজা ই সিলভা বলেন, “আমি বলসোনারোকে ভোট দিয়েছি যেন ব্রাজিল আবার প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।” 


লুলার প্রতিক্রিয়া

সাওপাওলোর একটি হোটেলে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে লুলা বলেন, প্রথম ধাপেই জয়ের বিষয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তিনি ঘোষণা দেন, “আগামীকাল থেকে আমরা একটি নতুন প্রচারণা শুরু করব।”

এদিকে, লুলার মিত্ররা আশঙ্কা করছেন, লুলা জয়ী হলে ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার করতে পারে। যদিও ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে সমর্থন দেননি, তবে তিনি হোয়াইট হাউজে সিনেটর বলসোনারোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রশংসা করেছেন। 


সব মিলিয়ে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেওয়া দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন এখন ব্রাজিলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। রবিবার বিকেলে ব্রাজিলের নির্বাচনি আদালতের প্রধান কাসিও নুনেস মার্কস নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে চলছে বলে জানিয়েছেন।


তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি