বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

ইরান যুদ্ধে ‘হার মানলেন’ ট্রাম্প? ২৩ বছর পর ৪,৫০০ লাশ ডিঙিয়ে কেন খালি হাতে ইরাক ছাড়ল আমেরিকা?

সোনার দেশ ডেস্ক ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৪১ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৪১ অপরাহ্ন
ইরান যুদ্ধে ‘হার মানলেন’ ট্রাম্প? ২৩ বছর পর ৪,৫০০ লাশ ডিঙিয়ে কেন খালি হাতে ইরাক ছাড়ল আমেরিকা?

আফগানিস্তানের পর এ বার ইরাক। ২৩ বছরের মাথায় পশ্চিম এশিয়ার খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশটি ছেড়ে ‘ল্যাজ গুটিয়ে’ চম্পট দিল মার্কিন ফৌজ! ইরান যুদ্ধের আবহে আর এক মোর্চায় পুরোপুরি আত্মসমর্পণ ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকার? না কি পর্দার আড়ালে থেকে বাগদাদের তরল সোনা লুটের অন্য ছক কষে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র? এই সৈন্য প্রত্যাহারে ভারতের লাভ কতটা? সব কিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণে মেতে রয়েছে বিশেষজ্ঞ মহল।


চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে সর্বশেষ মার্কিন সৈন্যকে ঘরে ফেরায় আমেরিকা। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতেই বিবৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেখানকার মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, ‘‘মার্কিন ফৌজ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক জোট বাহিনী আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানের এরবিল বিমানঘাঁটি থেকে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে সুশৃঙ্খল ভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।’’


ইরাক থেকে মার্কিন ফৌজ প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জসিম আল-বাহাদলি। ইরানের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘জোট-সেনার প্রস্থানে কৌশলগত ভাবে সবচেয়ে লাভবান হল তেহরান। এ বার অনায়াসেই বাগদাদের ভিতরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারবে তারা।’’


জসিমের এই ভবিষ্যদ্বাণী ফেলে দেওয়ার নয়। কারণ, মার্কিন ফৌজ সরতেই ইরাকের বিভিন্ন শহরে বিজয় উৎসবে মেতে ওঠেন এলাকাবাসী। সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সেই ভিডিয়ো। বাগদাদের ভিতরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে গোড়া থেকেই আপত্তি জানিয়ে এসেছে ইরান। তেহরানের মদতেই সেখানে গজিয়ে ওঠে চরম আমেরিকা-বিরোধী ‘ইসলামিক রেজ়িস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।


যুক্তরাষ্ট্র সেনা সরানোর পর সংবাদসংস্থা রয়টার্সের কাছে মুখ খোলেন ওই সংগঠনের কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি। তিনি বলেন, ‘‘ইরাকের ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায়ের অবসান হল। এখানে মার্কিন ফৌজের চরম পরাজয় ঘটেছে। আমাদের সার্বভৌমত্ব কোনও বিদেশি শক্তির দ্বারা সুরক্ষিত হতে পারে না। বরং জনগণের প্রতিরোধ ও ইচ্ছাশক্তির দ্বারা সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’’


উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরির অভিযোগ তুলে ইরাক আক্রমণ করে মার্কিন ফৌজ। ওই সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সাদ্দাম হুসেন। তাঁর বিরুদ্ধে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম রাখা হয় ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’। প্রথম দিকে এতে চমকপ্রদ সাফল্য পায় আমেরিকা। তাদের হাতে খুব অল্প দিনে পতন ঘটে বাগদাদের। তিকরিতের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ধরা পড়েন খোদ সাদ্দাম।


গ্রেফতারির তিন বছরের মাথায় সাবেক প্রেসিডেন্টকে ফাঁসিতে ঝোলায় আমেরিকা সমর্থিত ইরাকি সরকার। সাদ্দামের মৃত্যুতে পরিস্থিতি সহজ হবে বলে মনে করছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, বাস্তবে উল্টে যায় তাদের পাশার চাল। পরবর্তী বছরগুলিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পশ্চিম এশিয়ার দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে গজিয়ে ওঠে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ফলে, নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে আমেরিকা।


সুপ্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার জন্মভূমি ইরাকের জনসংখ্যাকে তিনটি মূল শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। সেখানবার বাসিন্দাদের প্রায় ৬১ শতাংশই শিয়া মুসলিম। বাকি, ২৯ শতাংশ সুন্নি ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং আরব জাতিগোষ্ঠীভুক্ত। এ ছাড়া, ১০ শতাংশ কুর্দ জনজাতির লোকও বাস করেন সেখানে। শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বাগদাদের শাসনভার অধিকাংশ সময় থেকেছে সুন্নিদের হাতেই।


উদাহরণ হিসাবে সাদ্দামের কথা বলা যেতে পারে। তিনি ছিলেন সুন্নি ধর্মাবলম্বী। ফলে, তাঁর মৃত্যুতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ইসলামের ওই শাখাভুক্ত ইরাকি নাগরিকেরা। অন্য দিকে, ১৯৭৯ সালে ইসলামীয় বিপ্লবে প্রতিবেশী ইরানের শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভাবে চলে যায় শিয়া ধর্মগুরুদের হাতে। সেখানকার জনসংখ্যারও বড় অংশই ছিল মুসলিমদের ওই শাখাটির অন্তর্ভুক্ত। ফলে, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে দেরি করেনি বাগদাদের শিয়া সম্প্রদায়।


সাদ্দাদের মৃত্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে মেতে ওঠে এই তিন গোষ্ঠী। এদের দমন করতে স্থানীয় বাহিনীকে লেলিয়ে দেয় মার্কিন সেনা। শুধু তা-ই নয়, ইরাকি ফৌজের শক্তি বৃদ্ধি করতে তাদের প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই কর্মকাণ্ডের সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন নিউ ডন’ রাখে আমেরিকা। তার পরেও বহু এলাকা বিদ্রোহীদের দখলমুক্ত করতে ব্যর্থ হয় ওয়াশিংটন।


স্থানীয় বিদ্রোহীদের পাশাপাশি ১৯৯৯ সালে ‘জামাত আল-তাওহিদ ওয়াল-জিহাদ’ নামের মার্কিন-বিরোধী একটি জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয় পশ্চিম এশিয়ায়। ২০০৪ সালে কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়দার হাত ধরে তারা। ২০১৩ সালে উত্তর-পশ্চিমের প্রতিবেশী সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তাদের শাখা। ফলে ওই বছরই আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া’ বা আইসিস।


জন্মের পর ইরাকি ভুখণ্ডে মার্কিন ফৌজের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে নামে সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী। তাদের চোরাগোপ্তা হামলায় প্রাণ হারান বহু আমেরিকান সৈনিক। ফলে, ২০১৪ সালে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজ়লভ’ রাখে পেন্টাগন। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে চলেছে এই সংঘর্ষ।


২০১৯ সালের অক্টোবরে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে আইসিসের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্বঘোষিত ‘খলিফা’ আবু বকর অল-বাগদাদিকে ঘিরে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কমান্ডো বাহিনী। ওই সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় তাঁর। এ ছাড়া, ২০২২ সালে বাগদাদির স্থলাভিষিক্ত হওয়া আবু ইব্রাহিম আল-হাশেমি আল-কুরেশি এবং এ বছরের মে মাসে আবু খাদিজার মতো কুখ্যাত জঙ্গি নেতাদের নিকেশ করে আমেরিকা।


কিন্তু, তার পরেও আইসিস পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, তা বলা যাবে না। তাদের বাদ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে কুর্দ গোষ্ঠী। বর্তমানে ইরাকের উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পুরোপুরি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। স্বায়ত্তশাসিত ওই কুর্দিস্তান অঞ্চলটির ভিতরে রয়েছে চারটি প্রদেশ। সেগুলি হল, এরবিল, সুলাইমানিয়া, দহুক এবং হালাবজা।


প্রসঙ্গত, ইরাক ত্যাগের আগে সেখানকার তিনটি মূল গোষ্ঠীর মধ্যে একটি প্রশাসনিক সমঝোতা করিয়েছে আমেরিকা। এর জেরে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদ পাচ্ছেন কুর্দরা। অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের স্পিকারের কুর্সি শিয়া ও সুন্নিদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানকার খনিজ তেল উত্তোজনে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলির সুবিধা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।


যদিও আমেরিকার এই স্বপ্ন আদৌ পূরণ হওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান বিশেষজ্ঞ মহল। এ বিষয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুন্নি নেতা আবদুল আল-জোবাই বলেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে একেবারেই প্রস্তুত হয় ইরাক।’’ দেশ জুড়ে ফের আইসিসের বাড়বাড়ন্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।


প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে কুর্দ কমান্ডার সিরওয়ান বারজ়ানিকে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন থাকাকালীনই ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করেছিল আইসিস। তাদের হাতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন ফৌজ সরে গেলে তারা যে নিজেদের সংগঠিত করে ফের আক্রমণ শানাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?’’


তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত দু’দশকের বেশি সময় ধরে ইরাকে থাকায় ৪,৫০০-র বেশি সৈনিক হারিয়েছে আমেরিকা। সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ুক, তা আর চাইছে না ওয়াশিংটন। আর তাই ২০২৪ সালেই বাগদাদ থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মত হন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ক্ষমতা পেয়ে তাঁর সেই সিদ্ধান্তে কোনও বদল ঘটাননি ট্রাম্প। যদিও পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দু’বছর সময় লাগিয়েছে পেন্টাগন।


প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশের দাবি, ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য সরায় সেখানে প্রভাব বৃদ্ধির মরিয়া চেষ্টা চালাবে ইরান। পশ্চিম এশিয়ায় কোনও আরব রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী থাকুক, সেটা চায় না তেহরান। বাগদাদের ঘটনাকে তাই সাফল্য হিসাবেই দেখছে তারা। এতে সাবেক পারস্যের মদতপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি যে চাঙ্গা হয়ে উঠবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অনেকে আবার বিষয়টিকে ইরান যুদ্ধে আমেরিকার আংশিক পরাজয় স্বীকার হিসাবেও দেখছেন।


বর্তমানে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম খনিজ তেল সরবরাহকারী দেশ হল ইরাক। বাগদাদের জ্বালানি ব্যবসায় মার্কিন ‘অনুপ্রবেশ’ থাকলেও এই লেনদেনে নয়াদিল্লির সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে, সৈন্য প্রত্যাহারে দেশটি গৃহযুদ্ধের মুখে পড়লে কপাল পুড়বে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের। কারণ, তখন সেখান থেকে তরল সোনা আমদানি করা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন