১২-১৫ টুকরো হতে চলেছে পাকিস্তান!
পাকিস্তানের প্রশাসনিক মানচিত্রে বড় বদল! একাধিক ছোট ছোট রাজ্যে গোটা দেশকে ভাগ করতে চলেছেন রাওয়ালপিন্ডির ‘সিপাহ্সালার’। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীতে লাগাতার বাড়ছে স্থানীয় স্বশস্ত্র বিদ্রোহীদের দাপাদাপি। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ইসলামাবাদের গলদঘর্ম দশা! সেই কারণেই কি এই সিদ্ধান্ত? জল্পনা তীব্র হওয়ায় গোটা বিষয়টির উপর কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লিও।
সম্প্রতি, পাক প্রশাসনিক মানচিত্রের বদল পরিকল্পনা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনপ্রিয় ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট। সেখানে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দু’টি বিকল্প কার্যত চূড়ান্ত করে ফেলেছে ইসলামাবাদ। যাতে এ বার সিলমোহর দেবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার। উল্লেখ্য, গোটাটাই হচ্ছে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অঙ্গুলিহেলনে।
দ্য ইকোনমিস্ট জানিয়েছে, নতুন নিয়মে চারের বদলে ১২-১৫টি প্রদেশে ভাঙতে চলেছে পাক প্রশাসন। দ্বিতীয় বিকল্প হিসাবে ১৬০টি ছোট ছোট অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে মুনিরের। এই দু’য়ের মধ্যে শাহবাজ় সরকার কোনটা বেছে নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পর্যবেক্ষক মহলের বড় অংশের দাবি, এ ব্যাপারে শেষ কথা বলার অধিকারী ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শাল, ‘ঠুঁটো-জগন্নাথ’ প্রধানমন্ত্রী নন।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় দেশভাগের মাধ্যমে জন্ম নেয় পাকিস্তান। তার পর থেকেই মূলত চারটি প্রদেশে বিভক্ত থেকেছে ইসলামাবাদের প্রশাসনিক মানচিত্র। সেগুলি হল, পঞ্জাব, সিন্ধ, বালোচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকা। ২০১০ সালে ১৮তম সংবিধান সংশোধনীতে সর্বশেষ প্রদেশটির নাম বদলায় ইসলামাবাদ। সেই থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পরিচিতি পাচ্ছে খাইবার-পাখতুনখোয়া (কেপি) হিসাবে।
বর্তমানে একরকম দেউলিয়া হওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানে। ঋণের পর ঋণ নিয়ে কোনও মতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ইসলামাবাদের অর্থনীতি। এ-হেন পরিস্থিতিতে কেন হঠাৎ প্রদেশ বিভাজনের সিদ্ধান্ত নিলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির? কাগজে-কলমে অবশ্য এর নেপথ্যে সুস্পষ্ট কিছু যুক্তি রয়েছে। তা ছাড়া, এতে পশ্চিমের প্রতিবেশীর প্রশাসনিক কাঠামোর ফৌজের উপর নির্ভরশীলতা বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
যদিও ভুলেও সে কথা মুখে আনছেন না মুনির। সূত্রের খবর, ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শালের যুক্তি, জনসংখ্যা এবং আয়তনের নিরিখে চার প্রদেশ পুরোপুরি ভাবে ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে পঞ্জাবের কথা বলা যেতে পারে। একে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল এবং সমৃদ্ধশালী এলাকা বললে অত্যুক্তি হবে না। সব মিলিয়ে বর্তমানে সেখানে থাকছেন প্রায় ১২.৮০ কোটি মানুষ। যেটা গোটা দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি।
অন্য দিকে, আয়তনের নিরিখে বৃহত্তম পাক প্রদেশ হল বালোচিস্তান। কিন্তু, জমি বেশি হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার জনসংখ্যা খুবই কম। মেরেকেটে সেটা ১.৫০ কোটির আশেপাশে বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের খবর, প্রদেশ বিভাজনের মাধ্যমে এই বৈষম্য দূর করতে চাইছেন মুনির। তাঁর বক্তব্য, এতে তুলনামূলক ভাবে সহজ হবে প্রশাসন পরিচালনা। বেশি পরিমাণে সরকারি পরিষেবা পৌঁছবে আমজনতার দুয়ারে।
পশ্চিমি গণমাধ্যমটির দাবি, মুনির মনে করেন, মোট চারটি বড় প্রদেশে গোটা দেশ বিভক্ত থাকার কারণেই অর্থনীতি, বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজরকাড়া পারফরম্যান্সে ব্যর্থ হচ্ছে পাকিস্তান। এ ব্যাপারে ঘনিষ্ঠ মহলে বারবার পঞ্জাবের কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। ফিল্ড মার্শালের যুক্তি, জনসংখ্যা বেশি হওয়ার জেরে ওই সমৃদ্ধশালী প্রদেশটি পরিচালনায় গুরুতর প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে মারাত্মক জল-সংকট। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে সরকারি পরিষেবা নিতে হচ্ছে গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের। অন্য দিকে, পঞ্জাবের এক-চতুর্থাংশ বাড়িতে রয়েছে পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা। প্রদেশ বণ্টনের মাধ্যমে এই ছবি বদলের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন মুনির, বলছে বিশেষজ্ঞ মহল।
আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমান দুরাবস্থার জন্য পাকিস্তান নিজে দায়ী। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ৩৩-৩৪ বছর সরাসরি সামরিক শাসনে থেকেছে ইসলামাবাদ। এই পর্বে দেশের জমি, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং যাবতীয় ব্যবসা পুরোপুরি কব্জা করে ফেলে ইসলামাবাদের ফৌজ। ফলে, প্রদেশ ভাগাভাগিতে আদৌ সেখানকার আমজনতা কতটা লাভবান হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, ছোট ছোট এলাকায় গোটা দেশকে ভাগ করে নাগরিকদের বজ্র-আঁটুনিতে বেঁধে ফেলতে চাইছেন মুনির। তাঁর পরিকল্পনা সফল হলে কেন্দ্র এবং রাজ্য, দু’টি জায়গাতেই প্রশাসনের মাথায় থাকবে দুর্বল সরকার। ফলে, এলাকা পুনর্বিন্যাসের নামে তাদের উপর প্রভাব বিস্তারের একরকম ‘ফাঁকা চেক’ যে পাক ফৌজ পেতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
তা ছাড়া, প্রদেশ বিভাজনে বদলাতে পারে ইসলামাবাদের ঘরোয়া রাজনীতির ভরকেন্দ্রও। ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীতে মূলত দু’তিনটি শক্তিশালী দল রয়েছে। সেখানকার পঞ্জাব প্রদেশটি পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ)-এর শক্তি ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। এই দলের টিকিটে জিতে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছেন শাহবাজ়। পঞ্জাবের আঞ্চলিক সরকারও পরিচালনা করছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল।
সিন্ধে আবার পাকিস্তান পিপল্স পার্টির (পিপিপি) জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। অতীতে এই দলের টিকিটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন জুলফিকার আলি ভুট্টো ও তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টো। বর্তমানে পশ্চিমের প্রতিবেশীর প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে রয়েছেন আসিফ আলি জারদারি। সম্পর্কে যিনি বেনজিরের স্বামী। এ ছাড়া, পিপিপির চেয়ারপার্সন তথা বেনজির পুত্র বিলাবল বেশ কিছুদিন সামলেছেন ইসলামাবাদের বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, আগামী দিনে প্রদেশ বিভাজন সম্পন্ন হলে কিছুতেই আগের মতো জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে না পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ) এবং পিপিপি। তখন ছোট ছোট এলাকায় আঞ্চলিক সমস্যাকে সামনে রেখে গজিয়ে উঠতে পারে আরও কিছু দল। নির্বাচন জিততে সেনার সাহায্য নেবে তারাও। ফলে সব দিক থেকেই লাভবান হবে ফৌজ। প্রশাসনে রীতিমতো শিকড় গেড়ে বসবে তারা।
বিচ্ছিনতাবাদী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের দু’টি প্রদেশে দিন দিন বাড়ছে অশান্তি। সেই তালিকায় নাম আছে বালোচিস্তান এবং খাইবার-পাখতুনখোয়ার। কেপি আবার সাবেক প্রধামন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) খাস তালুক। যাদের নেতৃত্বে মুনির ও শাহবাজ সরকারের বিরুদ্ধে দানা বেঁধেছে গণবিক্ষোভ। যেটা সামাল দিতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে ইসলামাবাদ।
২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি হারান ইমরান। ক্ষমতা যেতেই বিভিন্ন অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করে পাক পুলিশ। গত সাড়ে তিন বছর ধরে জেলে রয়েছেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, গোটাটাই মুনিরের চক্রান্ত। আর তাই পিটিআই সমর্থকদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ফলে অস্বস্তি বাড়ছে ফিল্ড মার্শালের। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সেই কারণে প্রদেশ ভেঙে রাজনৈতিক বিভাজনের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
পাশাপাশি, খাইবার-পাখতুনখোয়া এবং বালোচিস্তানে প্রবল ভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। কেপিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। প্রদেশটির বহু এলাকার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তাদের। সেখানে ঢুকতেই পারে না পাক ফৌজ। একই অবস্থা বালোচিস্তানেরও। সেখানে আবার গেরিলা যুদ্ধে মুনির বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, প্রদেশ বিভাজনে এই দুই এলাকায় সামরিক অভিযান চালাতে সুবিধা পেতে পারে ইসলামাবাদের ফৌজ। ছোট ছোট এলাকা ধরে বিদ্রোহীদের উপর মুঠো শক্ত করার সুযোগ পাবে তাঁরা। তা ছাড়া, এই সুযোগে পাক অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরকেও (পিওজেকে) একাধিক অঞ্চলে ভাগ করতে পারেন মুনির। যেখানকার বিক্ষোভ ও আন্দোলনও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে তাঁর।
পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রস্তাব নতুন নয়। অতীতে এ ব্যাপারে মুখ খুলে খবরের শিরোনামে আসেন পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল। প্রদেশ ও জেলার সংখ্যা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১২-১৫ এবং ১৬০ করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। ’৪৭ সালের পর অন্তত দু’বার এই ধরনের ইসলামাবাদকে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গিয়েছে। যদিও সেই ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়।
১৯৫৫ সালে চারটি প্রদেশকে একত্রিত হয়ে গড়ে ওঠে একটি পশ্চিম পাকিস্তান। এতে অবশ্য একেবারেই খুশি ছিল না সেখানকার আমজনতা। ১৯৭০ সালে পুরনো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন ইসলামাবাদের তৎকালীন সেনাশাসক ইয়া হিয়া খান। ঠিক তার পরের বছরই (পড়ুন, ১৯৭১ সাল) পশ্চিমের প্রতিবেশীর হাত ছেড়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে কেপিতে যুক্ত হয় উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা। পরবর্তী সময়ে সেখানে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সূচক।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন