বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

সৌদি আরব আর ‘নিরাপদ নয়’, আতঙ্কে প্রবাসীরা

সোনার দেশ ডেস্ক ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:২৭ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:২৭ অপরাহ্ন
সৌদি আরব আর ‘নিরাপদ নয়’, আতঙ্কে প্রবাসীরা
রিয়াদে রেস্তোরাঁয় খাবার খাচ্ছেন কয়েকজন/ ফাইল ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। কিন্তু ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলায় সেই নিরাপত্তার ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছে।


রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে হামলার পর দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, সৌদি আরবে তাদের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত।


শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন দ্বিতীয় দফা হামলায় আরও একজন নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হন।


ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাবেই এসব আক্রমণ চালানো হয়েছে।


সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল-ইখবারিয়ায় প্রচারিত বিমানবন্দরের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাদা পোশাক পরা যাত্রীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি করছেন। বিমানবন্দরের একটি অপেক্ষাকক্ষে ধুলা ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে মেঝেতে পড়তে দেখা যায়।


‘পরিবারকে দেশে পাঠানোর কথা ভাববো’

সাত বছরের বেশি সময় ধরে রিয়াদে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল বলেন, ধর্মীয় সফরে গিয়ে তীর্থযাত্রীদের কখনোই প্রাণহানির আশঙ্কায় থাকতে হওয়া উচিত নয়।


তিনি বলেন, হুথিরা কোনোভাবেই এই হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারবে না। সাধারণ মানুষের ওপর হামলার কোনো অজুহাত নেই। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অতীতে যুদ্ধে যা-ই করে থাকুক, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা সমর্থনযোগ্য নয়।


বিলাল জানান, সৌদি আরবে তার ভালো বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন রয়েছে। তাই দেশ ছেড়ে যাওয়া তার জন্য সহজ সিদ্ধান্ত হবে না। তবে হামলার ব্যাপকতা ও ঘন ঘন আক্রমণের ঘটনায় প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে বেসামরিক স্থানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই। আমি ও আমার পরিবার এখানে জীবন গড়ে তুলেছি। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং হামলা ঘন ঘন ঘটতে থাকলে পরিবারকে দেশে পাঠানোর কথা ভাববো কি না? অবশ্যই ভাববো।


গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে রিয়াদে বসবাস করেছেন আরেক ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদ। তার কাছেও সৌদি আরব পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য নিরাপদ জায়গা ছিল। তবে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্র বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলা ঠেকাতে না পারায় তিনি উদ্বিগ্ন।


মোহাম্মদ বলেন, আমার সন্তানরাও এসব ঘটনায় বেশ আতঙ্কিত। আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি যে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানানোর পর তাদের বোঝানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার কথায়, রিয়াদ আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।


সৌদির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা

হুথিদের হামলা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পর্যটন ও বিনোদন খাতের কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে দেশটির সরকার।


রোববার রিয়াদে একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনে প্রত্যাশার তুলনায় অল্পসংখ্যক প্রতিনিধি অংশ নেন। দুই সপ্তাহ পর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিমানবন্দরে হামলার পর দেশটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ তুলে ধরতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিরোধ। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হুথিরা। ২০১৪ সালে জ্বালানি ভর্তুকি কমানো নিয়ে অসন্তোষ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়।


নতুন ফেডারেল কাঠামোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান-সমর্থিত হুথিরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয় এবং রাজধানী সানা দখল করে। এতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।


এর জবাবে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করাই ছিল ঘোষিত লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা ও যুক্তরাজ্যের তৈরি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। দীর্ঘ সংঘাতে ক্ষুধা, রোগব্যাধি ও জরুরি পরিষেবা ভেঙে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পরবর্তী সময়ে দেশটিকে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিনোদন ও পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।


কিন্তু হুথিদের হামলা এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন—দুই ঘটনাই সৌদির এসব উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার দুর্বলতা সামনে এনেছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।


ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগরকে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু হুথিদের লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ফলে সেই পথও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।


এর আগে সানা বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার পর হুথিরা পাল্টা অবরোধের হুমকি দিয়েছিল। তাদের অভিযোগ, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকার আকাশসীমা ও পরিবহনব্যবহারে বাধা দেওয়ার জবাবেই তারা সৌদি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করছে।


যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সংকট উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনও সামনে এনেছে।


বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক প্রবেশাধিকারের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও প্রযুক্তি কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে ওই অঞ্চলের প্রধান সামরিক অংশীদার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।


তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপসাগরীয় বিশ্লেষকের মতে, এই সম্পর্ক এখন গুরুতর চাপে রয়েছে। তার বক্তব্য, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ ছেড়ে যুদ্ধের পথে যাওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ, এ সংঘাত সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক মিত্রদের এমন পরিণতির মুখে ফেলেছে, যে যুদ্ধ তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।


রিয়াদে হামলার পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও সৌদি আরবের হতাশা বাড়িয়েছে বলে মনে করেন ওই বিশ্লেষক। ট্রাম্প বলেছিলেন, সৌদি আরব নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম।


বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে এবং ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছে। কিন্তু যখন হুমকি বাস্তবে দেখা দেয়, তখন সেটিকে সৌদি আরবের নিজের সামলে নেওয়ার বিষয় বলে উড়িয়ে দিলে ওই অংশীদারত্বের প্রকৃত মূল্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।


এ পরিস্থিতিতে গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির গুরুত্ব বেড়েছে। চুক্তিটির লক্ষ্য হলো সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করা। তবে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সম্ভাব্য সময় ও পরিসর এখনো অনিশ্চিত।


সৌদি আরবের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু সামরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবন, বিদেশি কর্মীদের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও।


তথ্যসূত্র: দ্য মিডল ইস্ট আই, জাগোনিউজ