বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাচ্ছে ঢাকাই মসলিন
প্রায় ২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধারের পর এবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটি কার্পাস তুলা শনাক্তকরণ, হাতে সুতা কাটা ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতে কাপড় বোনার প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর তা বাণিজ্যিকভাবে বেসরকারি খাতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
মসলিন দেখে দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
একসময় বাংলার রাজদরবার ও অভিজাতদের পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত ঢাকাই মসলিন ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। সূক্ষ্ম বুনন ও মিহি সুতার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক কদর ছিল।
নানা কারণে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্প ফিরিয়ে আনতে সরকারি উদ্যোগে ২০১৩ সালে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়।
ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক মো. আইয়ুব আলী বাংলানিউজকে বলেন, পাঠ্যবইয়ে পড়া বাঙালির ঐতিহ্য এখন নিজেরা তৈরি করতে পারছি।
শুধু মসলিন তৈরি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিও আমাদের হাতে এসেছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের উদ্যোক্তা ও ক্রেতারা মসলিনে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ফ্রান্সে মুঘল ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন, এমন কয়েকজনও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ গজ মসলিন নেওয়ার অনুরোধ এসেছে।
তিনি বলেন, দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে ১৫ জন উদ্যোক্তা আবেদন করেছেন। উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিয়ম ও পদ্ধতিও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে মসলিন দেখে দেশীয় শৌখিন ও সচ্ছল ক্রেতারাও আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে এখনই প্রকল্পের তৈরি কাপড় বিক্রির পরিকল্পনা নেই। বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ঢাকাই মসলিন কাপড় বাজারে ছাড়া হবে।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ২৭টি শাড়ি, ২০টি স্কার্ফ ও রুমালের মতো ১১টি নমুনা কাপড় তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে তৈরি হয় আরও ৩১টি শাড়ি ও ১৪টি স্কার্ফ। এসব নমুনা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে।
কীভাবে ফিরল ঢাকাই মসলিন
পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে ঐতিহাসিক নথি, গবেষণাপত্র ও জাদুঘরে সংরক্ষিত মসলিনের নমুনা পর্যালোচনা করা হয়। প্রকল্পের মুখ্য গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মঞ্জুর হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, জেমস টেলরের ‘এ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’, অধ্যাপক আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’ এবং সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের ‘স্পিসিস প্ল্যান্টারাম’ বই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঐতিহাসিক কাপড়ের নমুনা পরীক্ষায় যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সহায়তা নেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা ৩৯টি তুলার নমুনার মধ্যে ছয়টি জাত শনাক্ত করা হয়। পরীক্ষায় গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকার তুলার সঙ্গে ঐতিহাসিক মসলিনে ব্যবহৃত ফুটি কার্পাস তুলার ডিএনএর প্রায় ৯৬ শতাংশ মিল পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক নথি ও জেমস টেলরের বিবরণ পর্যালোচনা করে কাপাসিয়ায় ফুটি কার্পাস তুলা পাওয়ার সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়। কাপাসিয়ার পাশাপাশি তিতাবাদি নামের একটি স্থান নিয়েও অনুসন্ধান হয়। এসব গবেষণার ভিত্তিতে তুলা চাষ, হাতে সুতা কাটা ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতে কাপড় বোনার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
সাধারণ মসলিন থেকে ঢাকাই মসলিন কেনো আলাদা
ঢাকাই মসলিনের বিশেষত্ব ছিল নির্দিষ্ট জাতের তুলা, হাতে কাটা সূক্ষ্ম সুতা, দক্ষ কারিগর ও বিশেষ ধরনের তাঁতের সমন্বয়। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল, বিশেষ করে সোনারগাঁ, কাপাসিয়া এবং শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর অববাহিকার উর্বর পলল মাটিতে ফুটি কার্পাস তুলা জন্মাত।
অতিসূক্ষ্ম সুতা কাটতে আর্দ্র পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী অঞ্চলে সকাল বা সন্ধ্যায় সুতা কাটার কাজ হতো। শুষ্ক বাতাসে সূক্ষ্ম সুতা ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় পরিবেশের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেত। দক্ষ নারী ও পুরুষ কারিগররা বংশপরম্পরায় অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সুতা তৈরি ও কাপড় বুনতেন।
প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলী জানান, কাপাসিয়ার তুলার সুতায় সিল্কের মতো স্পর্শ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক মসলিনের সূক্ষ্মতা ও বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে ফুটি কার্পাসের জাত শনাক্ত করা ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কারিগর তৈরি ও প্রযুক্তি হস্তান্তর
মসলিন তৈরির জন্য ফুটি কার্পাস তুলা, হাতে কাটা সুতা এবং তাঁতে কাপড় বোনা—এই তিনটি বিষয় অপরিহার্য বলে জানান আইয়ুব আলী। তুলার জাত শনাক্ত হওয়ার পর গাজীপুরে তুলা বোর্ডের জমি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে তুলা চাষ করা হয়।
কারিগর তৈরির জন্য কুমিল্লার চান্দিনায় খাদি কাপড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০০ জনের মধ্য থেকে বাছাই করে ছয়জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। হাতে সুতা কাটার চরকা তৈরি থেকে শুরু করে সুতা প্রস্তুত, নাটাই করা, তাঁতে সুতা সাজানো ও কাপড় বোনার বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।
আইয়ুব আলী জানান, প্রশিক্ষিত কারিগরদের পাশাপাশি মসলিন হাউসে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৩০ জন তাঁতি ও কারিগরকেও উৎপাদনে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
অধ্যাপক মঞ্জুর হোসেন বলেন, বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য ফুটি কার্পাস তুলার জোগান বাড়াতে হবে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তুলা চাষের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া এবং চুক্তিভিত্তিক তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে চাষি ও উৎপাদকদের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসংস্থান ও বাজারের সম্ভাবনা
বাণিজ্যিকভাবে বেসরকারি খাতে মসলিন উৎপাদন শুরু হলে তুলা চাষ, সুতা কাটা, কাপড় বোনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। গ্রামীণ পর্যায়ে তুলাচাষি ও কারিগরদের যুক্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী মসলিনের পুনরুদ্ধার যুক্ত হলে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে উৎপাদন বাড়াতে পর্যাপ্ত ফুটি কার্পাস তুলা, দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কার্যকর বিপণনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে অতিসূক্ষ্ম মসলিন তৈরি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এর দাম সাধারণ কাপড়ের তুলনায় বেশি হতে পারে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে এর দাম কতটা থাকবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয় ও বাজারজাতকরণ কৌশলের ওপর। তবে ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সংগ্রহের জন্যও মসলিনের চাহিদা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুনরুদ্ধার করা প্রযুক্তি, দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং ১৫ উদ্যোক্তার আবেদনে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন শুরু ও দীর্ঘমেয়াদে তা সম্প্রসারণের সাফল্য নির্ভর করবে পর্যাপ্ত তুলা, দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ের ওপর।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ