আমের খোসা দিয়ে চা বানিয়ে ৩ তরুণের চমক
দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের জন্য বিখ্যাত। জেলায় চাহিদার তুলনায় আমের ব্যাপক উৎপাদন হওয়ায় ন্যায্য দাম না পেয়ে যখন হতাশ আমচাষিরা, ঠিক তখনই ফেলে দেওয়া আমের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে চা! শুনতে অবাক লাগলেও, ‘দেশের ইতিহাসে প্রথম’ এমনই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন জেলার ভোলাহাট উপজেলার তিন শিক্ষিত বন্ধু।
তাদের তৈরি এই চায়ের নাম ‘ম্যাংগো পিলটি’। অল্প পরিসরে শুরু হয়েছে বাজারজাতকরণও।
নতুন স্বাদের এই চা সাড়া ফেলেছে চা-প্রেমী ও দোকানিদের মধ্যে।
স্থানীয়রা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ন্যায্য দাম না পেয়ে যখন চাষিরা আমগাছ কাটতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই জেলার কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা আম প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
দেশীয় আম রপ্তানির আশা জাগিয়েও তা হোঁচট খাওয়ায় তরুণ উদ্যোক্তাদের এমন উদ্যোগ বেশ সাড়া ফেলেছে। তারা আম থেকে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের পণ্য, যেমন, আমের ড্রাই বার, আমের জুস, চকলেট, আমসত্ত্বসহ আরও অনেক কিছু।
সীমিত পরিসরে বাজারজাতও হচ্ছে এসব পণ্য।
এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে আমের ফেলে দেওয়া খোসা থেকে চা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার তিন উদ্যোক্তা। এখানকার এই তিন উদ্যোক্তা আমজাত বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি আমের খোসা থেকে চা তৈরি করছেন। তাদের দাবি, দেশের ইতিহাসে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম। শুধু তা-ই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে আমের খোসা শুকানোর যন্ত্রও তৈরি করেছেন তারা। এতে সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ছয় লাখ টাকা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় পড়াশোনা শেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি আম নিয়ে কাজ করছেন মোহা. মাইনুল ইসলাম। চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি এখন নিজ এলাকায় সফল উদ্যোক্তা।
তিনি গাজীপুরে একটি স্কুলে প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন এবং ৪০ হাজার টাকা লোকসান করেন। এরপর নিজ এলাকায় চারুপার্ক কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার দিয়ে পথচলা শুরু করেন। বাবার তেমন কোনো সম্পদ না থাকলেও ভালোই চলছিল তার ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আপওয়ার্ক, ফাইভারসহ ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলোর পরিবর্তনের কারণে তার ক্যারিয়ার একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
২০২১ সালে আম উৎপাদনে গিয়ে আমের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানে পড়েন তিনি। বন্ধু মিঠুনের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে কৃষকদের আম ফেলে দেওয়া বা গরুকে খাওয়ানোর ঘটনা দেখে আম সংরক্ষণের পরিকল্পনা করেন তিনি। বিনা পুঁজিতে মিঠুনকে নিয়ে আমসত্ত্ব তৈরি শুরু করেন। কিন্তু খোলা মাঠে শুকানো ও চুলায় গরম করার কারণে আমসত্ত্বে ধোঁয়ার গন্ধ, পাখির পালক ও ছাগলের লোম দেখতে পেয়ে প্রথমেই হোঁচট খান তারা।
টাকা না থাকলেও যন্ত্র কেনার পরিকল্পনা শুরু করেন তারা। বড় ভাই ও বন্ধু মাসুমকে বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত করে যন্ত্রাংশ কিনতে গিয়ে ১১ লাখ টাকা দাম জানতে পেরে আবারও হোঁচট খান। পরে নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায় নিজেরাই তৈরি করেন সেই যন্ত্র। পরে মেশিনটি বাসায় এনে ঈদের দিন টমেটো দিয়ে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়।
এরপর চলতি বছরের ৯ জুন প্রথম তারা আম নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক মানের, অর্থাৎ থাই মানের ড্রাই ম্যাঙ্গো তৈরি করতে সক্ষম হন। পরে ড্রাই ম্যাঙ্গোর পাশাপাশি প্রিমিয়াম মানের ম্যাঙ্গো লেদার, পাকা আমের সস ও পাকা আমের পাউডার তৈরি শুরু করেন তারা।
তরুণ উদ্যোক্তা মাইনুল ইসলাম জানান, দেশের চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় লেখাপড়া শেষ করে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে একই এলাকার আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে আম থেকে নতুন কিছু তৈরির পরিকল্পনা করেন তারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ মানেই আমের দেশ। আমের মৌসুমে রসালো ফলের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আমের খোসা ফেলে দেওয়া হয়। সেই খোসাকেই কাজে লাগিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে আমের খোসা প্রক্রিয়াজাত করে চা তৈরি করছেন তারা। এর নাম দিয়েছেন ‘ম্যাংগো পিলটি’।
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ফেলে দেওয়া একটি উপাদানকে নতুন পণ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। মাইনুল ইসলাম জানান, শুধু নামেই নয়, স্বাদেও রয়েছে ভিন্নতা। তার দাবি, এই চায়ে পাওয়া যায় আমের স্বাদ ও ঘ্রাণের বিশেষ অনুভূতি। এতে বিশেষ পুষ্টিগুণও রয়েছে। অল্প পরিসরে উৎপাদন করে এরই মধ্যে বাজারজাত শুরু করেছেন তারা।
তরুণ উদ্যোক্তা মিঠুন জানান, আম প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে তারা খেয়াল করেন, আমের খোসা ছাড়ানোর সময় আমের একটি অংশ নষ্ট হচ্ছে। সেখান থেকেই তাদের মাথায় আসে আমের খোসা দিয়ে চা তৈরির পরিকল্পনা। তিনি বলেন, তাদের নিরলস পরিশ্রমের পাশাপাশি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং আম গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিনের অবদানের কারণেই তারা এত কিছু করতে সক্ষম হয়েছেন।
নতুন উদ্যোক্তা হতে যারা আগ্রহী, তাদের প্রতি তার পরামর্শ, হতাশ না হয়ে বা চাকরির পেছনে না ছুটে আমকে কাজে লাগিয়েও অনেক কিছু করা সম্ভব।
অপর উদ্যোক্তা মাসুম আলী জানান, চীনের ১১ লাখ টাকার হিটার মেশিনের ওপর নির্ভর না করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে স্থানীয়ভাবে অর্ধেক দামে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন তারা। তাদের তৈরি যন্ত্রটিতে আমদানি করা মেশিনের চেয়ে চমৎকার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া রয়েছে।
তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বাজারসংযোগ পেলে ‘ম্যাংগো পিলটি’ সম্ভাবনাময় একটি স্থানীয় পণ্য হয়ে উঠতে পারে। তবে অর্থের অভাবে বড় পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারছেন না তারা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে রপ্তানি করতে না পারলেও স্থানীয় চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রপ্তানি করা সম্ভব বলে জানান তিনি। পাশাপাশি তাদের তৈরি যন্ত্র কেউ নিতে চাইলে সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন এই উদ্যোক্তা।
সাধারণত এক মণ (৪০ কেজি) আম থেকে খোসা ছাড়ালে প্রায় ১৫ কেজি খোসা পাওয়া যায়। যা প্রক্রিয়াজাত করে এক কেজি ‘ম্যাংগো পিলটি’ উৎপাদন করা হয়। এই চা তারা স্থানীয় বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি দুই থেকে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন।
প্রথমে আম ভালোভাবে ধুয়ে কীটনাশকমুক্ত করার পর খোসা ছাড়ানো হয়। আম থেকে তৈরি করা হয় বিভিন্ন আমজাত পণ্য। অন্যদিকে খোসাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শুকিয়ে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রমের পর গুঁড়া করে তৈরি করা হয় ‘ম্যাংগো পিলটি’।
অন্যদিকে আমচাষিরাও এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। কানসাটের আমচাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, তারা কয়েক বছর ধরে আমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আম থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও চা তৈরি করা হলে আমের কদর বাড়বে, বাড়বে দাম। জেলার অর্থনীতিও হবে আরও মজবুত।
এদিকে ভোলাহাটের প্রত্যন্ত এলাকায় আমের খোসার চায়ের নাম শুনেই ক্রেতাদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কেউ প্রথমবার স্বাদ নিচ্ছেন, কেউ আবার প্রচলিত চায়ের সঙ্গে এর পার্থক্য মিলিয়ে দেখছেন। স্থানীয় চায়ের দোকানিদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে আগ্রহ।
চায়ের দোকানি আব্দুল আলিম জানান, যারা আমের চা পান করছেন, তারা আর অন্য চা খেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়ায় এবং দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় তারাও লাভবান হচ্ছেন।
সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ জানান, তিনি প্রতিদিন অন্তত এক কাপ আমের চা পান করেন। তার মনে হয়, যেন আম খাচ্ছেন। কৃষি বিভাগও এ চায়ের পুষ্টিগুণ থাকার বিষয়টি জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাই নিয়মিত এ চা পান করেন।
পাশে থাকা সবিউল ইসলাম সবু মেম্বারও জানান, চায়ের ঘ্রাণ ও স্বাদ চমৎকার।
ভোলাহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সুলতান আলী চাহিদার তুলনায় আমের উৎপাদন বেশি হওয়ায় চাষিদের ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমশিল্পকে বাঁচাতে কৃষি বিভাগ আমজাত পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভোলাহাটের স্থানীয় তিন যুবক আম থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি ফেলে দেওয়া খোসাকে কাজে লাগিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এসব আমজাত পণ্য ও ‘ম্যাংগো পিলটি’ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, আমের মতো স্থানীয় কৃষিপণ্যের উপজাতকে কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য তৈরি হলে অপচয় কমানোর পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফেলে দেওয়া আমের খোসা থেকে নতুন পণ্য তৈরির এই উদ্যোগ শুধু ভিন্ন স্বাদের চায়ের গল্প নয়, এটি স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার ও উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন প্রচেষ্টারও গল্প।
তিনি এ উদ্যোগে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে এই চা রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলেও জানান এই বিপণন কর্মকর্তা।
এখন প্রয়োজন উদ্যোগটির সম্ভাবনা যাচাই, মানসম্মত উৎপাদন এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা। সব বাধা পেরিয়ে ‘ম্যাংগো পিলটি’ বাজারে কতটা জায়গা করে নিতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ