এই প্রথম বার সন্ধান মিলল সবুজ নক্ষত্রের!
কোনও নক্ষত্রের রং এমনও হতে পারে? এত দিন তা কল্পনাতেও আসেনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। সাধারণত কমলা, উজ্জ্বল সাদা কিংবা নীল— এই ধরনের রং দেখা যায় নক্ষত্রগুলির। এ বার এমন এক নক্ষত্রের কথা জানা গেল, যা দেখতে সবুজ রঙের। মহাকাশবিজ্ঞানীদের দাবি, এই প্রথম এমন সবুজ-রঙা কোনও নক্ষত্রের সন্ধান মিলল।
ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে এই গবেষণা চলে। সম্প্রতি ‘রাস টেকনিক্স অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্টস’ জার্নালে তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক ভাবে ১৫১টি বামন নক্ষত্র বিশ্লেষণ করে একটিই এমন সবুজ নক্ষত্রের সন্ধান মিলেছে। তবে গবেষকদলের অনুমান, ব্রহ্মাণ্ডে এমন আরও সবুজ নক্ষত্র ছড়িয়ে রয়েছে। যা এখনও বিজ্ঞানীদের নজরে আসেনি।
বাস্তবে এই প্রথম বার খোঁজ মিললেও কল্পবিজ্ঞানের কাহিনিতে এমন ‘সবুজ নক্ষত্রের’ কথা অবশ্য আগেও বলা হয়েছে। যেমন ডিসি কমিক চরিত্র নির্ভর সিনেমা ‘সুপার গার্ল’-এ এমন সবুজ রঙের নক্ষত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষকদলের প্রধান হল্যান্ডসের কথায়, “আমাদের এই মহাবিশ্ব মাঝে মাঝে কল্পবিজ্ঞানের মতোই অদ্ভুত।”
বেশির ভাগ নক্ষত্রের রং নির্ভর করে সেই নক্ষত্রটির তাপমাত্রার উপরে। এবং তা নির্দিষ্ট কিছু রঙের আভার মধ্যেই সীমিত। কিন্তু জ্যোতির্পদার্থবিদ হলান্ডসের মতে, কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্র অপ্রত্যাশিত কোনও রঙে জ্বলজ্বল করতে পারে।
তুলনামূলক কম ভরের নক্ষত্রগুলি যখন নিজেদের আয়ুর একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায় (পারমাণবিক জ্বালানি ফুরিয়ে যায়), সেই মৃতপ্রায় নক্ষত্রগুলি শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হয়। সে সময়ে নক্ষত্রের বাইরের স্তরগুলি মহকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভিতরের অংশটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের রূপ নেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের মৃতপ্রায় নক্ষত্রগুলি এক ধরনের ‘মহাজাগতিক খাদকে’ পরিণত হয়। এদের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করা গ্রহ, গ্রহাণুগুলিকে মহাকর্ষ শক্তির টানে গিলে ফেলে বামন নক্ষত্রগুলি। সঙ্গে ওই গ্রহ এবং গ্রহাণুতে থাকা ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম, লিথিয়াম বা আয়রনও নক্ষত্রে থাকা হিলিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। তার জেরেই কোনও কোনও ক্ষেত্রে সবুজ বা গোলাপি বা অন্য কোনও অপ্রত্যাশিত রঙের দেখাতে পারে গ্রহগুলিকে।
আমাদের সূর্যের তাপমাত্রার কেন্দ্র ভাগের ১ কোটি ৫০ লক্ষ-১ কোটি ৫৭ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃষ্ঠ ভাগের প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সূর্যের বা এর কাছাকাছি তাপমাত্রার অন্য কোনও নক্ষত্রকে সাদা রঙের দেখায়। তুলনামূলক শীতল নক্ষত্রকে কমলা এবং উষ্ণ নক্ষত্রকে হালকা নীলচে রঙের দেখায়। গবেষকদের মতে, বেশির ভাগ শ্বেত বামন নক্ষত্রের রং অন্য সাধারণ নক্ষত্রের মতোই সাদা রঙের হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের গ্যাসীয় মণ্ডলের রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তনের ফলে কিছু ক্ষেত্রে বিরল রং দেখা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ভাবে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে নক্ষত্রের রং সবুজ দেখায়, তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট নয়।
রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণ যে শ্বেত বামন নক্ষত্রগুলিতে ভিন্ন ভিন্ন রং দেখা যেতে পারে, তা আগেও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সেই মতো বিভিন্ন শ্বেত বামন নক্ষত্রকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন হল্যান্ডস এবং তাঁর সহযোগীরা। সেই পর্যবেক্ষণের সময়েই বিজ্ঞানীদের নজরে আসে সবুজ নক্ষত্রটি। আমাদের ছায়াপথ মিল্কি ওয়ের মধ্যেই রয়েছে নক্ষত্রটি। মহাকাশবিজ্ঞানীরা এর নাম রেখেছেন ‘ডব্লিউডি জে১৩৩৩০+৬৪৩৫’। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮০ আলোকবর্ষ(আলো এক সেকেন্ডে অতিক্রম করে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার। এক বছরে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকেই বলে আলোকবর্ষ। এক আলোকবর্ষ ৯.৫ লক্ষ কোটি কিলোমিটারের সমান) দূরে ড্র্যাকো নক্ষত্রপুঞ্জে রয়েছে এই সবুজ নক্ষত্রটি।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন