৩৫০ বছর আগে বিলুপ্ত ডোডো পাখি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছেন বিজ্ঞানীরা!
বিলুপ্ত ডোডো পাখিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছে একদল বিজ্ঞানী। ৩৫০ বছরেরও বেশি আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় উড়তে না পারা এই পাখি। সম্ভবত, ২০৩০ সালের গোড়ার দিকে আবারো পৃথিবীতে হাঁটতে দেখা যাবে পাখিটিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোলোসো বায়োসায়েন্সেস ডোডো পাখিকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ করছে।
টাইমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোডো পাখির প্রাচীন ডিএন-এর নমুনা খুবই কম টিকে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেসব নমুনার ডিএনএ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ফলে জিনগত তথ্যের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বিপুল তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করার দক্ষতা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কোলোসো সায়েন্সেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন লাম এক বিবৃতিতে বলেন, “বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যতটা না জীববিজ্ঞানের সমস্যা, তারচেয়ে বেশি সমস্যা তথ্য-উপাত্তের। এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) শিখে নেয় কীভাবে নিয়ন্ত্রক ডিএনএ জীবন্ত পাখিদের গঠন নির্ধারণ করে, এরপর এটি এমন সব জিনগত সুইচ শনাক্ত করে, যা ডোডো পাখির স্বতন্ত্র শারীরিক গঠন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।”
২০২৫ সালে কোলোসো বায়োসায়েন্সেস বিলুপ্ত প্রজাতি পুনরুজ্জীবিত করে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। সে বছর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বহু আগে বিলুপ্ত হওয়া ‘ডায়ার উলফ’-এর প্রাচীন ডিএন-এর অনুক্রম নির্ধারণ করেছে তারা। সেই তথ্য ব্যবহার করে বর্তমানে পৃথিবীতে টিকে থাকা ধূসর রঙের নেকড়ের জিনোমে পরিবর্তন এনেছে। বরফযুগের সেই ডায়ার উলফকে বিলুপ্তির ১০ হাজার বছরেরও বেশি সময় পর আবার জীবিত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরো বেশ কিছু বিলুপ্ত প্রাণী পুনরুজ্জীবিত করেছে। এ তালিকায় রয়েছে—উলি ম্যামথ, দ্য তাসমানিয়ান টাইগার, মোয়া পাখি (উটপাখির মতো দেখতে), অ্যান্টিলোপ বা মৃগজাতীয় ব্লুবাক। ডোডো পাখির কথা যদি ধরা হয়, তাহলে তার টলমলে হাঁটাচলা, ছোট ছোট ডানা, বড় বড় চোখ আর অদ্ভুত ঠোঁট—এসবের মধ্যে অন্য প্রাণীদের মতো কোনো শক্তি বা ক্যারিশমা নেই; আসলে এটাই তার বিশেষ আকর্ষণ।
১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘হাউ টু বিকাম এক্সটিংক্ট’ বইয়ে বলা হয়েছে—“ডোডো পাখির টিকে থাকার কোনো সুযোগই ছিল না।” নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন-এর লেখক উইল কাপি বইটি রচনা করেন। এতে তিনি লেখেন, “মনে হয়, কেবল বিলুপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যেই যেন এই পাখি সৃষ্টি হয়েছিল; আর অন্য কোনো কাজের জন্য পাখিটি মোটেও উপযুক্ত ছিল না। আমি ডোডোকে দোষ দিচ্ছি না, তবে সে ছিল এক অদ্ভুত অগোছালো প্রাণী। পর্তুগিজরা এদের ‘ডিউডোস’ বা ‘বোকা’ বলে ডাকত। কারণ ডোডো পাখি পর্তুগিজদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করত এবং তাদের এতটাই বিশ্বাস করত যে, লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করলেও বাধা দিত না।”
তবে যে প্রাণীকে নিয়ে উপহাস করা হয়, তাকে ভালোবাসাও যায়। আর ডোডোকে ফিরিয়ে আনতে সেই ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা। ডায়ার উলফের মতো প্লাসেন্টাযুক্ত স্তন্যপায়ী বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। কোলোসো বায়োসায়েন্সেসের গবেষকেরা প্রথমে জীবিত ধূসর নেকড়ের কোষ সংগ্রহ করেন। এরপর ১৪টি জিনে মোট ২০টি পরিবর্তন আনেন। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়ার উলফের সাদা লোম, বড় আকার, শক্তিশালী চোয়াল, শীতল আবহাওয়ায় টিকে থাকার উপযোগী বিপাকীয় বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
এরপর পরিবর্তিত কোষটির নিউক্লিয়াস বের করে এমন একটি ধূসর নেকড়ের ডিম্বাণুতে প্রবেশ করানো হয়, যার নিজস্ব নিউক্লিয়াস আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। নিষিক্ত ডিম্বাণুটিকে ভ্রূণে পরিণত হতে দেওয়া হয় এবং পরে সেটি একটি বড় আকারের গৃহপালিত কুকুরের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ৬০ দিনের কিছু বেশি সময় পর সেই মা কুকুর একটি নেকড়ের ছানা জন্ম দেয়।
তবে পাখিকে বিলুপ্তি থেকে ফিরিয়ে আনা আরো কঠিন। কারণ পাখির ভ্রূণ মায়ের শরীরের জরায়ুর ভেতরে নয়, ডিমের মধ্যে বিকশিত হয়। ডোডোকে ফিরিয়ে আনতে গবেষকেরা প্রথমে নিকোবর পায়রা থেকে আদিম জননকোষ বা প্রাইমোর্ডিয়াল জার্ম সেলস (পিজিসিএস) সংগ্রহ করবেন। ডোডোর বর্তমানে জীবিত নিকটতম আত্মীয় এই নিকোবর পায়রা। এই অপরিণত কোষগুলো থেকেই পরবর্তীতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরি হয়।
এরপর ধূসর নেকড়ের জিনে পরিবর্তন আনার মতোই এসব জননকোষে জিনগত পরিবর্তন করে ডোডোর বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হবে। পরিবর্তিত কোষগুলো একটি গৃহপালিত মুরগির ডিমের খোলস ভেদ করে অতি ক্ষুদ্র ভ্রূণের মধ্যে প্রবেশ করানো হবে। এরপর কোষগুলো ভ্রূণের জননাঙ্গের দিকে স্থানান্তরিত হয়ে সেখানে অবস্থান নেবে। পরিবর্তিত স্ত্রী মুরগিটি ডিম থেকে বেরিয়ে বড় হবে এবং পরিবর্তিত পুরুষ মুরগির সঙ্গে প্রজনন করবে। তারপর মুরগি এমন ডিম পাড়বে, যেগুলো থেকে তার মতো মুরগি নয়, বরং ডোডো পাখির জন্ম হবে।
কোলোসো বায়োসায়েন্সেসের পাখি প্রজাতি বিভাগের পরিচালক আনা কিটে বলেন, “আদর্শ পরিস্থিতিতে আমাদের হাতে যদি শত শত নিকোবর পায়রার ডিম থাকত, তাহলে আমরা পায়রাকেই বিকল্প মাতৃপ্রজাতি হিসেবে ব্যবহার করতাম। কিন্তু নিকোবর পায়রা নির্দিষ্ট ঋতুতে প্রজনন করে। বছরের মাত্র কয়েক মাস তারা ডিম পাড়ে, আর একবারে সাধারণত দুটি ডিম দেয়। অন্যদিকে, মুরগির ডিম সহজেই পাওয়া যায়। কিছু মুরগি প্রতিদিন একটি করে ডিম পাড়ে। তাই নিকোবর পায়রার তুলনায় মুরগির কাছ থেকে অনেক বেশি বিকল্প ডিম পাওয়া যায়।”
তবে প্রথমেই জননকোষে জিনগত পরিবর্তন আনা সহজ না। কারণ ডোডোর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী জিনোমের বহু স্থানে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে তার আইসক্রিম স্কুপ আকৃতির ঠোঁট তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষকেরা আসলে শুধু জিন নিয়ে কাজ করছেন না; তারা বিশ্লেষণ করছেন নিয়ন্ত্রক উপাদান বা রেগুলেটরি এলিমেন্টস—জিনোমের সেই অংশগুলো, যেগুলো নির্ধারণ করে কোন জিন কখন সক্রিয় হবে এবং কখন নিষ্ক্রিয় থাকবে।
শুধু পাখিটির ঠোঁটের ক্ষেত্রেই এই কাজের পরিধি বিশাল। ঠোঁটের আকারের সঙ্গে সম্পর্কিত ৬৫০টিরও বেশি নিয়ন্ত্রক উপাদান রয়েছে। আর ঠোঁটের পুরুত্ব ও প্রস্থের সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদানের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৭০০টি। তার ওপর প্রাচীন নমুনাগুলোর ডিএনএ খণ্ডিত হয়ে যাওয়ায় কোন নিয়ন্ত্রক উপাদান কীভাবে পরিবর্তন করতে হবে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়নি। এই ঘাটতি পূরণে কোলোসো তৈরি করেছে নতুন একটি এআই প্ল্যাটফর্ম, যার নাম জিনোমর্ফ।
জিনোমর্ফ তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা জিনগত একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন। এতে দেখানো হয়েছে, মুরগি, কোয়েল, হাঁস ও পায়রার ভ্রূণ বড় হওয়ার সময় মুখমণ্ডলের বিকাশ নিয়ন্ত্রণকারী জিনগত সুইচগুলো কীভাবে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় হয়। এরপর তারা ৭০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির জিনোম ও খুলির আকৃতি তুলনা করেছেন। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ডোডোর নিকটতম জীবিত আত্মীয় নিকোবর পায়রাও।
এই গবেষণার ফলে প্রায় ২ হাজার ৩৫০টি জিনগত সুইচের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেগুলো ডোডোর অস্বাভাবিক ঠোঁটের আকৃতি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে। গবেষকেরা এখন একে একে এসব সুইচ পরীক্ষা করছেন।
এই কাজের ভিত্তি তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি সাফল্য। প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষিত ডোডোর নমুনা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ একটি ডোডো জিনোম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এ কাজে তারা এমন সফটওয়্যার ব্যবহার করেছে, যা মূলত ডায়ার উলফের জিনোম বিশ্লেষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
কোলোসো বায়োসায়েন্সেসের প্রধান বিজ্ঞান কর্মকর্তা বেথ শাপিরো বলেন, “প্রাচীন জিনোমের ক্ষেত্রে এটি অসাধারণ একটি নমুনা। এতে কয়েকটি ছোটখাটো ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু প্রাচীন ডিএন-এর ক্ষেত্রে সাধারণত যে পরিমাণ ঘাটতি দেখা যায়, তার তুলনায় এখানে অনেক কম। ডোডোর জিনোম থেকে আমরা আসলে খুব বেশি কিছু হারাইনি।”
ডোডোর সবচেয়ে নাটকীয় বৈশিষ্ট্য তার ঠোঁট। কিন্তু তার আরো অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলোর জিনগত নির্দেশনা লুকিয়ে আছে ডোডোর জিনোমের প্রায় ২০০ কোটি লেটারের মধ্যে। এ কারণেই কোলোসোর বিজ্ঞানীরা ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। ডোডোকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
ডায়ার উলফের জিনোম পাঠ ও বিশ্লেষণের জন্য কোলোসো যে প্রযুক্তি তৈরি করেছিল, তার কিছু অংশ পরবর্তীতে ডোডোর জিনোম বিশ্লেষণের জন্য জিনোমর্ফ তৈরিতে কাজে লেগেছে। একইভাবে ডোডো নিয়ে চলমান গবেষণা ভবিষ্যতে অন্য বিলুপ্ত প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ ও জিনগত পরিবর্তনের কাজেও সহায়তা করতে পারে।
শাপিরো এক বিবৃতিতে বলেন, “ডায়ার উলফের জন্য তৈরি করা একটি পদ্ধতি এখন অন্য একটি প্রজাতি নিয়ে গবেষণায়ও মূল্যবান অবদান রাখছে—এটি সত্যিই আনন্দের। প্রতিটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এমন একটি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মের অংশ হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোকে আরো দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে।”
-টাইম অবলম্বনে ( রাইজিংবিডি)