মৃত্যুমুখী নক্ষত্রের গ্রাস থেকে বেঁচে গিয়েছে দু’টি গ্রহ? ধ্বংসাবশেষে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা
মহাকাশে কোনও নক্ষত্রের আয়ু ফুরিয়ে এলে তা নিজের সংসারের গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতুগুলিকেও গ্রাস করে নেয়। আগুনের গোলা গিলে ফেলে আশপাশের সমস্ত মহাজাগতিক উপাদান। আমাদের সূর্যের আয়ু ফুরিয়ে এলে পৃথিবী ও অন্য গ্রহগুলিরও সেই পরিণতি হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তবে সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় অন্য ইঙ্গিত মিলেছে। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা।
ইটালির ত্রিয়েস্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলা জেন্টিলে ফুসিলোর নেতৃত্বে গবেষকেরা মহাকাশে নতুন একটি মৃত নক্ষত্র খুঁজে পেয়েছেন। তার চারপাশে গ্রহ-উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা এত দিনের প্রচলিত ধারণা বদলে দিতে পারে। কোনও নক্ষত্র ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে তা আকারে অনেক বড় এবং স্ফীত হয়ে যায়। তার বাইরের স্তরগুলি মহাকাশে বিলীন হয়ে যায় ধীরে ধীরে। পড়ে থাকে কেবল কেন্দ্রভাগ। কেন্দ্রের ওই ঘন, মৃত অংশটিকে শ্বেত বামন পর্যায় বলা হয়। নিকোলারা সৌরজগৎ থেকে দূরে এমন একটি মৃত নক্ষত্র বা শ্বেত বামন নক্ষত্র খুঁজে পেয়েছেন। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডব্লিউডি জে১৩২৮-১৪৫০’। এই ধরনের নক্ষত্রের চারপাশে সাধারণত ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রহ-উপগ্রহের অবশিষ্টাংশ চ্যাপ্টা বলয়ের আকারে ঘুরতে থাকে। নতুন আবিষ্কৃত নক্ষত্রটির ক্ষেত্রে তা হয়নি। এখানে একটি নয়, দু’টি চ্যাপ্টা বলয় দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিস্ময় সেখানেই!
চিলির ইউরোপীয় মহাকাশ পর্যবেক্ষণাগারের শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে ‘ডব্লিউডি জে১৩২৮-১৪৫০’-কে পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ জার্নালে। দেখা গিয়েছে, নক্ষত্রটির পাশে বলয় দু’টির মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। গবেষকদের অনুমান, মৃত্যুমুখী রাক্ষুসে ওই নক্ষত্রের কবল থেকে তার দু’টি গ্রহ হয়তো কোনওক্রমে বেঁচে গিয়েছিল। তারাই দু’টি আলাদা গ্যাসীয় বলয় তৈরি করেছে।
মৃত নক্ষত্রের পাশে এখনও টিকে থাকা পাথুরে বস্তুগুলিকে সরাসরি টেলিস্কোপে দেখতে পাননি বিজ্ঞানীরা। গ্যাসের ঘূর্ণন, আচরণ দেখে সেগুলির উপস্থিতি অনুমান করা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, ওই দুই পাথুরে গ্রহ থেকে অনবরত গ্যাস নির্গত হচ্ছে এবং তা-ই পৃথক বলয়ের উৎস। নিকোলার কথায়, ‘‘নক্ষত্রের রূপান্তরের পরেও যে তার গ্রহগুলি টিকে থাকতে পারে, তা আমরা আগেই জেনেছিলাম। কিন্তু এখানে একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা এই প্রথম দেখা গেল। নক্ষত্রের চারপাশে এখানে দু’টি বলয় রয়েছে, যার ভিতরে সম্ভবত দু’টি পাথুরে খন্ডও টিকে আছে।’’
তবে বলয় দু’টি হুবহু একরকম নয়। তাতে কিছু উপাদানগত পার্থক্য রয়েছে। নিকটবর্তী বলয়টি নক্ষত্র থেকে ৬০ হাজার মাইল দূরে রয়েছে। তার বিস্তার ১ লক্ষ ৪৭ হাজার মাইল দূর পর্যন্ত। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই বলয়ের মধ্যে থাকা গ্রহটি মেরেকেটে ১০৭ মাইল চওড়া, যা আমাদের সৌরজগতের সাধারণ কোনও গ্রহাণুর সমান। দ্বিতীয় বলয়টির সঙ্গে ওই নক্ষত্রের দূরত্ব ২ লক্ষ ৩৪ হাজার মাইল। তা ৮ লক্ষ ৩৫ হাজার মাইল দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যেকার গ্রহটি প্লুটো বা আমাদের চাঁদের আকারের সমান হতে পারে।
দু’টি বলয়েই ক্যালশিয়াম, অক্সিজেন, আয়রনের মতো উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। তবে ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে কেবল প্রথম অর্থাৎ নক্ষত্রের নিকটবর্তী বলয়টিতেই। বিজ্ঞানীদের অনুমান, দু’টি পৃথক গ্রহ থেকে গ্যাসীয় বলয়গুলি তৈরি হতে পারে। একটি গ্রহে হয়তো ম্যাগনেশিয়াম ছিল এবং অন্যটিতে ছিল না। আবার এ-ও হতে পারে যে, কোনও একটি গ্রহই মৃত্যুমুখী নক্ষত্রের সেই গ্রাস থেকে বেঁচে গিয়েছিল এবং পরে তা দু’টি খণ্ডে ভাগ হয়ে গিয়েছে। প্রথম বলয় হয়তো তৈরি হয়েছে গ্রহটির কেন্দ্রের ম্যাগনেসিয়াম যুক্ত অংশ থেকে। দ্বিতীয় বলয়ের উৎস ওই গ্রহের বাইরের ম্যাগনেশিয়ামবিহীন স্তর।
‘ডব্লিউডি জে১৩২৮-১৪৫০’ এবং তার আশপাশের অঞ্চল দেখে বিজ্ঞানীরা আমাদের সূর্য এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কল্পনা করছেন। সূর্য শেষ পর্যায়ে পৌঁছে স্ফীত হয়ে গেলে পৃথিবী তার উত্তাপে ঝলসে যাবে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয়। তবে নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত, পৃথিবী বেঁচে গেলেও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তা এমন বলয় তৈরি করে মৃত সূর্যের পাশে থেকে যাবে। সেই সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য ফেলিপ লাগোস-ভিলচেস বলেন, ‘‘এই নক্ষত্রের পরিস্থিতি সামগ্রিক ভাবে আমাদের সৌরজগৎ এবং গ্রহমণ্ডলের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, তার আভাস দেয়।’’ তবে এ বিষয়ে আরও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ এবং আরও বিশদ গবেষণা প্রয়োজন, মানছেন গবেষকেরা।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন