মঙ্গলের ধুলোয় লুকিয়ে রয়েছে ‘বিষ’! চাঁদের চেয়েও বিপজ্জনক
লাল ধুলোয় মোড়া বিশাল এক মরুভূমি— মহাকাশ থেকে মঙ্গলের দিকে তাকালে তেমনই চোখে পড়ে। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা বলছে, মঙ্গলের সেই লাল ধুলো ভবিষ্যতের অভিযান পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারে। কারণ, ওই ধুলো মানুষের শরীরের জন্য বিপজ্জনক। নাসার ‘পারসেভারেন্স রোভার’ প্রায় ১,৬৫৪ মঙ্গল দিন ধরে সেখানে গবেষণা চালিয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, নাসায় গিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার কাজ সহজ হবে না। তার অন্যতম কারণ হল ওই লাল ধুলো।
কী দেখেছে নাসা?
নাসার যে রোভার মঙ্গলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে, তার উপরে রাখা ছিল একটি ‘স্পেসস্যুট’। তাতে যে ধুলো আটকে ছিল, তা পরীক্ষা করা হয়েছে। সেই পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ওই ধুলো এতটাই সূক্ষ যে তার ব্যাস মানুষের চুলের ব্যাসের চেয়েও কম (মানুষের চুল ৫০ থেকে ১০০ মাইক্রোমিটার চওড়া)। আর তা-ই ভয় ধরাচ্ছে বিজ্ঞানীদের। বিষয়টি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত হয়েছে।
মঙ্গলের ওই ধুলো বিশ্লেষণ করে মূলত দু’টি পদার্থের খোঁজ মিলেছে, যা ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে করা হচ্ছে। তার মধ্যে একটি ক্ষুদ্র কণার ব্যাস ২.৫ মিলিমিটারের কম। অন্য আলট্রাফাইন কণাগুলির ব্যাস ১০০ ন্যানোমিটারের কাছাকাছি। মানুষের চুলের ৭০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই কণা মানুষের ফুসফসে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে। এমনকি মানুষের রক্তজালিকাতেও প্রবেশ করতে পারে সেই ক্ষুদ্র কণা। মঙ্গলে বসে গবেষণা চালালে এই ধুলোকণা মানুষের শরীরের ক্ষতি করতে পারে।
চাঁদের ধুলোর থেকে কেন আলাদা?
নাসা বলছে, মহাকাশের প্রায় সব জায়গাতেই সমস্যা তৈরি করতে পারে ধুলো। চাঁদে অ্যাপোলো অভিযানের সময় হেলমেটের স্বচ্ছ অংশ ঝাপসা করে দিয়েছিল ধুলো। মহাকাশচারীদের পোশাকের সিল নষ্ট হয়েছিল। তাঁদের কয়েক জন জ্বর (হে ফিভার) নিয়ে ফিরেছিলেন।
কিন্তু মঙ্গলের ধুলো চাঁদের চেয়ে অনেক মসৃণ। কারণ সেই গ্রহের বাতাস তাকে প্রায় দুরমুশ করে মসৃণ করে দিয়েছে। তবে তাতে প্রচুর পরিমাণে সালফার, ক্লোরাইন, লৌহকণা, সিলিকা থাকে। চাঁদের ধুলোয় তা অতটা পরিমাণ থাকে না। মঙ্গলে মাঝেমধ্যে যে ঝড় হয়, তাতে সেই ধুলো ওড়ে, তার পরে কোথাও থিতিয়ে পড়ে।
কী ভাবে তথ্য পেল রোভার?
মহাকাশচারীদের যে পোশাক যানের উপর রাখা ছিল, তার পাঁচটি অংশ থেকে পাঁচটি নমুনা সংগ্রহ করেছিল ‘পারসেভারেন্স রোভার’। এক-একটি প্রায় ২০ মিলিমিটার চওড়া ছিল। তাতে জমে থাকা ধুলো পরীক্ষা করেছিল পিআইএক্সএল (প্ল্যানেটরি ইনস্ট্রুমেন্ট ফর এক্স-রে লিথোকেমিস্ট্রি) এবং শার্লক (স্ক্যানিং হ্যাবিটেবল এনভায়রমেন্টস উইথ রামন অ্যান্ড লুমিনেসেন্স ফর অর্গানিক অ্যান্ড কেমিক্যালস)। ওই দুই যন্ত্রই ছিল রোভারের ভিতরে। ধুলোর রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করেছিল পিআইএক্সএল। শার্লক ধুলোর উপাদান বিশ্লেষণ করেছে।
এই গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য, চাঁদের মতো মঙ্গলেও পা রাখবেন তাঁরা। সেখানে বসে গবেষণা চালাবেন। সে ক্ষেত্রে নতুন এই তথ্য কিন্তু উদ্বেগজনক। গবেষকেরা মনে করছেন, এ সব মাথায় রেখেই স্পেসস্যুট তৈরি করতে হবে। ধুলো পরিষ্কার করার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সেই মতো নাসা নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করেছে।
নাসার লিন্ডসে হেস জানান, অ্যাপোলো অভিযানের সময় থেকেই এই ধুলোবালি একটা বড় সমস্যা ছিল। তবে এ বার প্রথম, মানুষ মঙ্গলে যাওয়ার অনেক আগেই, সেখানকার ধুলোমাটির বিষয়ে যথাযথ তথ্য হাতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাতে সুবিধা হবে ভবিষ্যতের অভিযানেই বলে মনে করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইন