প্রাচীন গোড় নগরীর সিংহ দরজা ইতিহাসের নিরব সাক্ষী
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শেষ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ওপারে তাকালেই চোখে পড়ে ইতিহাসের এক প্রাচীন স্থাপনা। যেটা কোতওয়ালি দরজা, আবার কেউ কেউ সিংহ দরজা হিসেবে চিনে এ স্থাপনাকে।
সময়ের বিবর্তনে যার মূল খিলান ভেঙে গেছে, ক্ষয়ে গেছে দেয়ালের অনেক অংশ। তবু অবশিষ্ট স্থাপত্য আজও জানান দেয় কয়েক শতাব্দী আগের নগরসভ্যতা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন গৌড় নগরীর এই স্থাপনাটির নাম কোতওয়ালী দরজা। একসময় গৌড়ের উপনগরী থেকে মূল রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল এটি। ইতিহাসের পাতায় যার পরিচিতি ‘গৌড়ের সিংহদ্বার’ হিসেবে।
বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা অবস্থানের কারণে দূর থেকেও তোরণটি দেখা যায়। সীমান্তের জিরো লাইন থেকে এর দৃশ্য স্থানীয়দের পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে স্থাপনাটি ভারতের ভূখণ্ডে হওয়ায় সরাসরি পরিদর্শনের ক্ষেত্রে সীমান্ত সংক্রান্ত নিয়ম ও নিরাপত্তা বিধি মেনে চলতে হয়।
কোতওয়ালী দরজার নামের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে তৎকালীন নগর পরিচালনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ইতিহাস। ‘কোতওয়াল’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। প্রাচীন নগরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাকে কোতওয়াল বলা হতো। ইতিহাসবিদদের ধারণা, গৌড় নগরীর দক্ষিণ দিকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই তোরণ। নগরীতে প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতেও এর ভূমিকা ছিল।
স্থাপত্যের দিক থেকেও কোতওয়ালী দরজা ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। একসময় এর খিলানপথের উচ্চতা ছিল প্রায় ৩০ ফুট এবং প্রস্থ ১৬ ফুট ৯ ইঞ্চি। সম্পূর্ণ গৌড়ীয় ইট দিয়ে নির্মিত তোরণটির ভেতরে ও বাইরে ছিল চারটি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ। এসব বুরুজে অলংকৃত স্তম্ভ, সুঁচালো খিলান এবং নকশা করা কুলুঙ্গির নিদর্শন রয়েছে। তোরণের দুই পাশে শত্রুর ওপর কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য বিশেষ ছিদ্রও রাখা হয়েছিল। ভেতরে সশস্ত্র প্রহরীদের অবস্থানের জন্য ছিল আলাদা কক্ষ। এসব কক্ষের দেয়ালেও পোড়ামাটির অলংকরণ ও কারুকাজের পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক স্থাপনা, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নির্মাণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক জেনারেল কানিংহামের ধারণা, দিল্লির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সময় সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মৃত্যুর পর তোরণটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। তাঁর অনুমান অনুযায়ী, এর নির্মাণকাল ১২২৯ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি অথবা পরবর্তী কোনো সময়। ইতিহাসবিদ ড. দানির মতে, পান্ডুয়া থেকে গৌড়ে রাজধানী স্থানান্তরের পর নগরের প্রবেশপথ হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়। অন্যদিকে এম আবিদ আলী খানের ধারণা, ১২৩৪ থেকে ১৩১৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোনো একসময় তোরণটি নির্মিত হয়েছিল।
বর্তমানে সময়ের ক্ষয় ও অবহেলায় কোতওয়ালী দরজার আদি অবয়ব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মূল খিলান ভেঙে পড়লেও অবশিষ্ট বুরুজ, দেয়াল ও অলংকরণে এখনো ফুটে ওঠে মধ্যযুগের নির্মাণশৈলী। একসময় যে তোরণ ছিল একটি সমৃদ্ধ নগরীর প্রবেশপথ, আজ সেটিই অতীতের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কোতওয়ালী দরজা শুধু ভারতের মালদহ অঞ্চলের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, দুই বাংলার অভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও এর ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। কয়েক শতাব্দী পেরিয়েও স্থাপনাটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে গৌড়ের নগরজীবন, সামরিক কৌশল এবং সমৃদ্ধ স্থাপত্য ঐতিহ্যের কথা।