দক্ষিণ আফ্রিকায় পুরুষহীন আদিম সমাধি! মিলল কেবল নারীদেহের কঙ্কাল!
বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি মেনে মৃতদেহ সৎকার কেবল আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সরাই করে। কারণ তাদের বুদ্ধি আছে, চেতনা আছে। অথচ, নৃতত্ত্ব বলছে অন্য কথা। এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া পৃথিবীর আদিমতম সমাধিক্ষেত্রটি আধুনিক মানুষের নয়, এমনকি নিয়ান্ডারথালেরও নয়। ‘হোমো নালেডি’ নামে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগের আমাদেরই পূর্বপুরুষের। তবে আশ্চর্যের বিষয় শুধু এটা নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘রাইজিং স্টার’ গুহায় খুঁজে পাওয়া হোমো নালেডিদের এই গোরস্থানে প্রাপ্ত কুড়িটি কঙ্কালের একটিতেও নেই পুরুষ প্রজাতির চিহ্ন!
জোহানেসবার্গের কাছে ‘রাইজিং স্টার’ গুহার বুক চিরে নেমে গিয়েছে এক অন্ধকার, দমবন্ধ করা সুড়ঙ্গ। সেই অন্ধকারে, সূর্যালোক থেকে বহু দূরে, ঘুমিয়ে ছিল এই হোমো নালেডিরা। আজ থেকে প্রায় দু’লক্ষ ছত্রিশ হাজার থেকে তিন লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত তারা। কমলালেবুর মতো ছোট্ট মস্তিষ্ক তাদের, যা আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এই মস্তিষ্ক নিয়েও তারা সজ্ঞানে মৃতদেহ সমাধিস্থ করত, আগুন জ্বালাত, এমনকি গুহার গায়ে আঁকিবুঁকিও কাটত। এটি আবার প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন কোনও ভাবেই একটি সরল রৈখিক বা কেবল স্যাপিয়েন্স-কেন্দ্রিক আখ্যান নয়।
২০১৩ সালে প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্ট (জীবাশ্ম-নৃবিজ্ঞানী) লি বার্গারের দল প্রথম এই ‘রাইজ়িং স্টার’ গুহা থেকে প্রায় ১৫০০ জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছিল। গুহার ওই অংশ এতটাই দুর্গম যে, ২০২২ সালে সেখানে ঢোকার জন্য ছ’ফুট দু’ইঞ্চি উচ্চতার বার্গারকে প্রায় পঁচিশ কিলোগ্রাম ওজন কমাতে হয়েছিল। জোহানেসবার্গের সেই গুহার নিস্তব্ধতা থেকে দৃশ্যপট বদলাল মাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপোলজি এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতে। আণবিক বিজ্ঞানী প্যালেসা মাদুপে এবং এনরিকো কাপেলিনির নেতৃত্বে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় ‘সেল’ এবং ‘ই-লাইফ’ জার্নালে। তাঁদের সামনে তখন পড়ে আছে ওই গুহা থেকে সংগৃহীত অন্তত কুড়িটি কঙ্কালের তেইশটি প্রাচীন দাঁত। এত পুরনো জীবাশ্মে উষ্ণ আবহাওয়া পার করে ডিএনএ টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। তাই ভরসা কেবল দাঁতের এনামেলে লুকিয়ে থাকা প্রোটিন। মানবশরীরের সবচেয়ে শক্ত অংশ দাঁতের এনামেল। তাই এর ভেতরে থাকা প্রোটিন অনেক দীর্ঘ সময় সুরক্ষিত থাকে। গবেষক মাদুপের কথায়, এনামেলের এই প্রোটিনগুলো হল “সুদূর অতীত থেকে জিনগত তথ্য সংগ্রহের সেরা মাধ্যম।”
মানুষের ক্ষেত্রে লিঙ্গ মূলত এক জোড়া সেক্স ক্রোমোজ়োম দ্বারা নির্ধারিত হয়। পুরুষদের একটি ‘এক্স’ এবং একটি ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম (ঢণ) এবং নারীদের দুটি ‘এক্স’ ক্রোমোজোম (ঢঢ) থাকে। দাঁতের এনামেলে ‘অ্যামেলোজেনিন’ নামের একটি প্রোটিন থাকে, যা বিশ্লেষণ করে ‘এক্স’ এবং ‘ওয়াই’ সিগন্যাল চিহ্নিত করা যায়। এই প্রোটিনের মাধ্যমে ওই কুড়িটি কঙ্কালের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে গিয়েই থমকে গেলেন বিজ্ঞানীরা। কম্পিউটার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা ফলাফল জন্ম দিল এক অবিশ্বাস্য রহস্যের। একে একে কুড়িটি কঙ্কালের তেইশটি দাঁতের নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, প্রত্যেকটিতেই জ্বলজ্বল করছে ‘এক্স’ সিগন্যাল, কিন্তু ‘ওয়াই’ কোথাও নেই! এর থেকে বিজ্ঞানীরা অন্তত উনিশ জনকে ‘মহিলা’ বলে চিহ্নিত করেছেন। বাকি এক জনের প্রোফাইলও মহিলাদের সঙ্গেই মিলে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, গুহার সবচেয়ে বড় খুলির অধিকারী ‘নিও’, যাকে এতকাল এক বলিষ্ঠ পুরুষ ভেবে এসেছেন বিজ্ঞানীরা, সে-ও আদতে এক নারী! এই কুড়ি জনের মধ্যে দশ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং দশ জন শিশু। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর পর কুড়িটি কঙ্কালই মহিলা হওয়ার সম্ভাবনা দশ লক্ষে মাত্র এক বার (০.০০০০৯৫৪ শতাংশ)। প্রধানত নারীদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে এমন কেবল মাত্র আরেকটি প্রাচীন স্থানের কথাই জানা যায় যা পর্তুগালের এসকুরাল গুহায় পাওয়া গিয়েছিল। এই গুহাটি ব্যবহার করত হোমো নালেডিদের বহু পরের নতুন পাথরের যুগের কৃষিজীবী মানুষেরা।
লি বার্গার যেন চোখের সামনে দেখতে পেলেন লক্ষাধিক বছর আগের এক দৃশ্য। ছোট্ট মস্তিষ্কের ওই আদিম মানবেরা কি তবে সচেতন ভাবেই শুধুমাত্র নারীদের জন্য তৈরি করেছিল এক পবিত্র সমাধিক্ষেত্র? বার্গারের অনুমান বলছে, হ্যাঁ, হোমো নালেডিরা লিঙ্গভেদে সচেতন ভাবে মৃতদেহ সমাধিস্থ করত। তিনি আরও জানান, আধুনিক মানুষদের মধ্যে যারা মৃতদেহ লিঙ্গ অনুযায়ী আলাদা করত, তারাও সাধারণত মৃত পুত্রশিশুদের মায়ের সঙ্গেই সমাহিত করত। কিন্তু হোমো নালেডিরা শিশুকন্যাদের নিয়ে এলেও কোনও পুত্রসন্তানকে ওই স্থানে আনেনি। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্নার্ড উড মাটি খুঁড়ে সমাধিস্থ করার তত্ত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও, এটা মানতে বাধ্য হন যে, মৃতদেহগুলিকে অন্তত ওই গুহায় বয়ে আনা হয়েছিল। আর তা কোনও গভীর আবেগ বা সাংস্কৃতিক আচরণ ছাড়া সম্ভব নয়। না হলে, একটি সমাধিক্ষেত্রে শুধুমাত্র এক লিঙ্গের মানুষের হাড়ের স্তূপ ব্যাখ্যার অতীত। পুরুষদের মৃতদেহ তবে কোথায়? অন্য কোনও অজানা সুড়ঙ্গে? নাকি নারীরাই ছিল এই সমাজের অবিসংবাদিত কর্ত্রী, যাদের বিদায়বেলায় দেওয়া হত এই চূড়ান্ত সম্মান?
স্পেনের বার্সেলোনার আণবিক জীববিজ্ঞানী সারলেস লালুয়েজা-ফোক্স এই গবেষণার সিদ্ধান্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে, সময়ের স্রোতে প্রোটিন নষ্ট হয়ে গিয়ে ‘ওয়াই’ সিগন্যাল হারিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। যদিও গবেষকদের পাল্টা দাবি, কুড়ি লক্ষ বছরের পুরনো প্যারান্থ্রপাস জীবাশ্মেও এই পুরুষ-চিহ্ন অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। অন্য একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা হল, জিনগত অদ্ভুত বিবর্তন বা ‘জিন ডিলিশন’। পুরুষদের উপস্থিতি থাকতে পারে, কিন্তু তা হয়তো দৃশ্যমান নয়। বিরল কিছু ক্ষেত্রে, ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোমে থাকা প্রোটিন তৈরির জিনটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন—অস্ট্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রায় ০.১৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের একটি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮ শতাংশ পুরুষের মধ্যে এই জিনের অনুপস্থিতি দেখা গিয়েছে। এমনকি এক নিয়ান্ডারথাল পুরুষের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। হোমো নালেডি প্রজাতির পুরুষদের শরীরে জন্মগত ভাবে যদি একই ভাবে এই জিনটি বিলুপ্ত হয়ে থাকে, তবে পরীক্ষায় তাদের প্রত্যেককেই নারী বলে মনে হবে।
ক্লিভল্যান্ড মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচরাল হিস্ট্রির জৈব-প্রত্নতাত্ত্বিক এলিজ়াবেথ সচুক জানিয়েছেন, “সহজ কথায় বলতে গেলে, এমনিতেই এক অদ্ভুত আদিমানব প্রজাতির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত অদ্ভুত এক ফলাফল। তবে পুরুষ সিগন্যাল না-পাওয়া মানেই যে সেখানে পুরুষ ছিল না, তা প্রমাণ হয় না।” একই সঙ্গে, সেন্ট মাইকেল্স কলেজের জীববিজ্ঞানী পল কনস্ট্যান্টিনোর সহজ প্রশ্ন, “পুরুষদের তো অস্তিত্ব ছিলই, নইলে প্রজাতিটা এল কোথা থেকে? তা হলে তারা গেল কোথায়?” এই রহস্যের সমাধান করতে হলে ওই গুহা থেকে অন্তত এক জন নিশ্চিত পুরুষের কঙ্কাল খুঁজে পেতে হবে বিজ্ঞানীদের। আর সেই উত্তরের খোঁজেই তোলপাড় বিশ্ব বিজ্ঞানমহল।
কিন্তু উত্তর যা-ই হোক না কেন, ‘রাইািজং স্টার’ গুহার আপাতত পুরুষহীন ওই সমাধিক্ষেত্র আবার প্রমাণ করে যে, মানব ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই আজও অজানা। এই গবেষণা আরও একবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিবর্তনের ইতিহাসে বুদ্ধিমান জীব হিসেবে আধুনিক মানুষের একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্ব কোনওদিন ছিল না। কারণ, আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা এমন সব বিস্ময়কর কাজ করত, যা উন্নত বুদ্ধিমত্তা এবং জটিল মনস্তত্ত্বেরই প্রমাণ দেয়।
তথৗসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন