সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬

গুদামে নিম্নমানের চাল, এক মাসেও দেওয়া হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন

WP Import ০৯ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৪ অপরাহ্ন
WP Import ০৯ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৪ অপরাহ্ন
গুদামে নিম্নমানের চাল, এক মাসেও দেওয়া হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন
গুদামে নিম্নমানের চাল, এক মাসেও দেওয়া হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহীর বিভিন্ন খাদ্যগুদামে নিম্নমানের চাল সরবরাহ নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। হতদরিদ্র ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় যেসব সুবিধাভোগী এসব চাল পান তা একেবারেই খাওয়ার অযোগ্য। রাজশাহী দুর্গাপুর ও বাগমারা উপজেলায় খাদ্যগুদাম থেকে এই চাল পাওয়া যায়। নি¤œমানের চাল উদ্ধারের ঘটনায় এরই মধ্যে বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ খাদ্যগুদামের উপ-পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুর্গাপুর উপজেলা খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই দুটি ঘটনার পাশাপাশি জেলার অন্য উপজেলার খাদ্যগুদামগুলোর অবস্থা খতিয়ে দেখতে মোট আটটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। অবশ্য ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করার কথা ছিল। কমিটি এক মাস পার হয়ে গেলেও এখনও প্রতিবেদন দেয়নি।

দুর্গাপুর ও বাগমারায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়ে গুদামে নিম্নমানের চালের সরবরাহ। একটি চক্র নি¤œমানের চাল সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা। এ ঘটনায় একজনকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন কর্তৃপক্ষ। নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে তা মিলে ছাঁটাই করে চাল সংগ্রহ করার কথা খাদ্য গুদামগুলোর। কিন্তু তা না করে নি¤œমানের চাল কিনে গুদামে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন খাদ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। সম্প্রতি রাজশাহীর দুর্গাপুর ও বাগমারা উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও খাদ্যবান্ধব প্রকল্পের ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করতে গিয়ে খাবার অনুপযোগী চাল দেখতে পান জনপ্রতিনিধিরা।

এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করলে সরেজমিনে ভবানীগঞ্জ ও দুর্গাপুর খাদ্য গুদাম পরিদর্শনে গিয়ে এর সত্যতা পান। সম্প্রতি চালের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। এতটাই নিম্নমানের চাল যা গবাদি পশু ও খাবে না বলে মন্তব্য করেন জনপ্রতিনিধিরা।

দুর্গাপুরের জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রুপালি খাতুন বলেন, চাল ভালো না। কোনো বস্তার চালই খাওয়ার যোগ্য নয়। এমনকি গরুও খাবে না। এই চাল দরিদ্র মানুষদের দেওয়া হতো।
বাগমারার বড়বিহানালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান মিলন বলেন, ফুড অফিস বা সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা এই নিম্নমানের চাল কিনেছেন অতিরিক্ত মুনাফার জন্য। কিন্তু মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। খাদ্য কর্মকর্তারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছেন। কেন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, আমরা এখানে প্রায় ২৩ ধরনের চাল সংগ্রহ করেছি। নমুনা সংগ্রহ করেছি। সেগুলো অত্যন্ত নি¤œমানের। আমরা এটার মান স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি। আমরা আমাদের মতো প্রতিবেদন দিয়েছি।

ক্ষুব্ধ সুবিধাভোগীরাও। তারা জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় যে প্রকল্প চলছে, তাতে কার্ডধারীরা ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি করে চাল পান প্রায় ৮২ হাজার মানুষ। এছাড়া, খাদ্যবান্ধব প্রকল্পের আওতায় বছরের মধ্যে ৬ মাস ৫০ হাজার হতদরিদ্র মানুষ বিনামূল্যে মাসে ৩০ কেজি করে চাল পান। তবে এইসব চাল যদি খাবার উপযোগী না হয়, তাহলে এই মানুষগুলো কীভাবে খেয়ে বাঁচবে?
এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভবানীগঞ্জ খাদ্য গুদামের উপ-পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করে নওগাঁর নিয়ামতপুরে বদলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, ১৪-১৫ জন লেবার তাড়াহুড়া করে গাড়ি থেকে মাল নামায়। একটা-দুইটা ফসকে যেতে পারে। আর আমার কাছে তেমন জনবলও নেই। তাই এমন হয়েছে। যারা এই কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শুধু আমাকেই বদলি করা হয়েছে।

বাগমারা উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা নবী নওয়াজেস আমীন সেতু বলেন, স্টাফ স্বল্পতার কারণে সবগুলো গাড়ি চেক করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এজন্য কিছু চাল অনিচ্ছাকৃতভাবে চলে এসেছে। এরপর থেকে আমরা সতর্ক অবস্থায় আছি।

এ ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও এক মাস পার হওয়া সত্ত্বেও তা জমা হয়নি। এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ওমর ফারুক।
তবে খাদ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একটি সিন্ডিকেট ভালো চাল সরিয়ে খারাপ চাল সরকারি গুদামে ঢুকাচ্ছে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত মাসোয়ারাও পাচ্ছেন এবং নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ তৈরি করেছেন। চলতি বছরে এই সিন্ডিকেট প্রায় ৫ কোটি টাকারও বেশি লালচে গন্ধযুক্ত চাল সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ধরা পড়ায় তা ভেস্তে যায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত তিন মাসে জেলার ৯টি খাদ্যগুদামে সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ টন চাল খাবার অনুপযোগী। জেলায় সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।