তীব্র শীতে বোরোর বীজতলা নিয়ে সংশয়!
রাজশাহীতে গেল এক সপ্তাহ থেকে চলছে তীব্র শীত। এর সঙ্গে দেখা মিলেছে ঘনকুয়াশায়। গেল তিনদিন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে এসেছে। আগামী কয়েক দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। আর এতে বোরো ধানের বীজতলা ও আলুর খেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন কৃষক। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা কম থাকা এবং ঘন কুয়াশা থাকলে ফসল বিভিন্ন রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এর ফলে ফলন ও গুণগত মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দুর্গাপুর উপজেলার পাঁচুবাড়ী এলাকার কৃষক মোবাশ্বের আলী সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে বীজতলায় বীজ বপণ করছেন। তিনি বলেন, গেলবারের চেয়ে এবার বেশি দামে বীজ কিনে বপণ করেছেন। অঙ্কুরিত হওয়ার সময় গত কয়েক দিনের তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় অধিকাংশ চারা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। এ অবস্থায় চারা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন তিনি।
চারঘাট উপজেলার বরকতপুর গ্রামের কৃষক একরামুল হক। নিজের চার বিঘা জমিতে বোরো রোপণের প্রস্তুতি হিসেবে বীজতলায় বীজ বপন করেছেন। কনকনে ঠান্ডা আর সকালের ঘন কুয়াশায় ঠিকমতো গজায়নি ধান বীজ। যেগুলো গজিয়েছে সেগুলোও বিবর্ণ রূপ ধারণ করছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় বীজতলায় পানি পরিবর্তন, ঢেকে রাখাসহ নানা যত্ন নিয়ে চারাগাছকে রোপণ উপযোগী করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি।
গত সপ্তাহে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর দেখা না পাওয়ায় বোরোর বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। ইতোমধ্যে কিছু জায়গায় বীজতলা হলুদ ও ফ্যাকাসে বর্ণও ধারণ করেছে। তীব্র শীতের কারণে অনেকে বীজতলা প্রস্তুত করতে পারছেন না। বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হলে চারা সংকটের পাশাপাশি বাড়তি উৎপাদন খরচের আশঙ্কা করছেন কৃষক।
তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পর্যাপ্ত বোরো চারা উৎপাদনের প্রস্তুতি রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চারা সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে ও অধিক কুয়াশা না পড়লেও সেভাবে বীজতলার বড় ক্ষতি হবে না। বীজতলা রক্ষায় মাঠ পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সর্বাত্মক কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার পবা উপজেলায় ৫ হাজার ৮৪৫ হেক্টর, গোদাগাড়ীতে ১৪ হাজার ৭৩৫, মোহনপুরে ৭ হাজার ১০৪, বাগমারায় ১৭ হাজার ৯৮০, তানোরে ১৪ হাজার ১৩০, চারঘাটে ৩৩০, বাঘায় ১ হাজার ১৫, পুঠিয়ায় ২ হাজার ৭৫০, দুর্গাপুরে ৪ হাজার ৩৭৫, মেট্রোতে ৩৬ হেক্টরসহ ৯ উপজেলায় ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে।
সরেজমিন জেলার গোদাগাড়ী, চারঘাট ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগাম যেসব বীজতলা তৈরি করা হয়েছিল সেগুলোর চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু ১৫-২০ দিন আগে যেসব বীজতলায় বীজ বপন করা হয়েছিল, সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার চাঁন্দলাই গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার হার ঠিক থাকলেও গজানোর পর কয়েক দিনের ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে কিছু চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে যে পরিমাণ জমিতে বোরো আবাদের জন্য তিনি বীজতলা প্রস্তুত করেছিলেন, সে চাহিদা পূরণ হবে না। এখন তাকে বাড়তি চারা কিনে জমিতে লাগাতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, তীব্র শীত ও কুয়াশায় বীজতলা খোলা থাকলে চারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে এবং প্রতিদিন সকালে বীজতলার পানি পরিবর্তন করে নতুন পানি দেওয়ার জন্য। জানুয়ারি মাসজুড়ে চারা তৈরি করা যাবে। আর কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি অফিসাররা আছেন।#