‘জোর যার মুল্লুক তার’- প্রমাণ দিলেন ট্রাম্প
পাঁচ মাস আগে নিকোলাস মাদুরোর গ্রেফতারি চেয়ে পুরস্কার বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিল আমেরিকা। ওই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মাদুরো বলেছিলেন, ‘আসুন না, তুলে নিয়ে যান দেখি!’- শনিবার বেডরুম থেকে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে অপহরণ এবং বন্দি করে নেয়া হয়েছে আমেরিকায়।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর কাছে এটা দুঃস্বপ্নের মতই হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেয়া তার চ্যালেঞ্জ হয়তো ‘কথার কথা’ ছিল। কিন্ত সেটা যে আদতেই বাস্তবরূপ নিবে এটা সত্যিই ভাবা কঠিন। বিশ্ব রাজনীতিতে এমন ঘটনা হয়েই থাকে। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন হয়ে এসেছিল- তাতে মাদুরোর এমন পরিণতিতে অবাক হওয়ার মত কিছু নয়। একটি বিভাজিত দেশে শক্তিধর কোনো দেশ এমন আক্রমণ সফলভাবেই চালাতে পারে। এর উদাহরণও কম নেই।
১৯৮৯ সালে একই ধরনের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র পানামার তৎকালীন নেতা জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেফতার করেছিল। নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, পানামার বাহিনির হাতে এক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ‘মার্কিন নাগরিকদের রক্ষায়’ তারা হস্তক্ষেপ করে। তখনও যুক্তরাষ্ট্র নরিয়েগাকে ‘অবৈধ নেতা’ আখ্যা দিয়েছিল এবং নির্বাচনে নরিয়েগার বিপরীতে পরাজিত প্রার্থীকে দেশের ‘বৈধ নেতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। নরিয়েগাকো ৪০ বছরের সাজা শুনিয়েছিল আমেরিকা।
নিকোলাস মাদুরোর ক্ষেত্রে অনেকটা একই রকমের ঘটনার সাজুস্য লক্ষ্য করা যায়। কাকতালীয় হলেও, নরিয়েগাকে তার দেশ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দিনটি ছিল ৩ জানয়ারি, মাদুরোকেও ওই ৩ জানুয়ারিতে তার দেশ থেকে তুলে নেয়া হলো। মাদুরোর বিরুদ্ধেও মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়, যা নরিয়েগার ব্রিুদ্ধে ছিল। মাদুরোকেও ক্ষমতা ছাড়তে আমেরিকা বারবার তাগিদ দিয়ে আসছিল। একটি স্বাধূন দেশের ওপর কী ভয়ঙ্কর খবরদারি!
এ রকম অজুহাত সৃষ্টি করে আমেরিকার আগ্রাসন বিশ্ব বারবার দেখেছে। কিন্তু আমেরিকা বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ায় তাদের কোনো অন্যায়কে প্রতিরোধ তো দূরের কথা প্রতিবাদও তেমনভাবে করা যায় না।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে- তা কতটা বৈধ, সেই প্রশ্ন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বেআইনি প্রমাণিত হলেও ওয়াশিংটনকে হয়ত কার্যকর কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে না। যা এর আগেও পড়তে হয়নি।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “নিরপেক্ষভাবে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি বিচার-বিবেচনা করলে বলতে হয়, এ অভিযানের মাধ্যমে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানবোধের অভাব মহাসচিবকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তিনি সবাইকে জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সম্মান ও সমর্থন প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন।”
নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে অভিযোগ এনেছে তা নেহাতই একটি অজুহাত তা ট্রাম্পের কথাতেই স্পষ্ট হয়েছে। ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প খোলাখুলিভাবেই ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলায় একটি সুষ্ঠু পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটি ‘পরিচালনা’ করবে এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ ব্যবহারের উপযোগী করে অন্যান্য দেশে বিক্রি করবে। বিশ্বের মোট মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ বা ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের চেয়েও বেশি।
এটা স্পষ্ট যে, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্যই হামলা চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক গ্রেফতার করে আমেরিকা নেয়া হয়েছে। ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এই আপ্তবাক্যেরই প্রমাণ দিলো যুক্তরাষ্ট্র।