মঙ্গলবার, এপ্রিল ২১, ২০২৬

আদানি বাড়াচ্ছে আর্থিক চাপ, জ্বালানি খাতের ‘বিদ্যুৎ দানব’ সামিট: জাতীয় কমিটি

সোনার দেশ ডেস্ক ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪১ পূর্বাহ্ন অর্থনীতি
সোনার দেশ ডেস্ক ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪১ পূর্বাহ্ন
আদানি বাড়াচ্ছে আর্থিক চাপ, জ্বালানি খাতের ‘বিদ্যুৎ দানব’ সামিট: জাতীয় কমিটি

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অনিয়মে ভরপুর’ ২৫ বছরের চুক্তি বাংলাদেশের বড় ‘আর্থিক বোঝার’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ আইনে সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামিটের পাশাপাশি চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের এসএস পাওয়ারের সঙ্গে ‘অসম চুক্তির’ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বছরে বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।

রোববার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটির তৈরি প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

এর আগে গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে জাতীয় কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, আদানির চুক্তির কারণে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম, যা সরকারের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

কমিটির সদস্য ও ইউনির্ভাসিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির চুক্তিতে ‘সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য’ মিলেছে। এসব তথ্য আদানিকে জানিয়ে তাদের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তার ভাষ্য, “বিলম্ব হলে আমাদের মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যাবে। লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।”

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত থেকে আটজন ব্যক্তির অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ এসব তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া হয়েছে এবং দুদক ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর আওতায় হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় অন্তর্বর্তী সরকার এ কমিটি গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ২০২১ সালে সংশোধিত আইনটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ‘ইনডেমনিটি আইন’ হিসেবে পরিচিত।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে প্রথমে দুই বছরের জন্য আইনটি প্রণয়ন করে। পরে ২০১২ সালে দুই বছর, ২০১৪ সালে চার বছর, ২০১৮ সালে তিন বছর এবং সর্বশেষ ২০২১ সালে পাঁচ বছরের জন্য এর মেয়াদ বাড়ানো হয়।

চব্বিশের আন্দোলনের পর ওই আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় হাই কোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন এবং অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, তারা যেকোনো সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় নথি নিরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে আহ্বান এবং চুক্তিতে সরকারের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে কি না তা যাচাই করতে পারবে।

‘দাম বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি’

প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করে কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক বলেন, সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনেছে, আদানির ক্ষেত্রে তার চেয়ে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হয়েছে। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল প্রতি ইউনিট ৮.৬১ সেন্টে, যা শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮৭ সেন্টে। এর ফলে বছরে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার আদানিকে দিতে হচ্ছে, যা চুক্তি বহাল থাকলে ২৫ বছর ধরে পরিশোধ করতে হবে।

কমিটির প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। মামলার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

“অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় সীমিত, তাই আমরা চাই পরবর্তী সরকার যেন এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়।”

বিশ্ব ব্যাংকের জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) পরিশোধিত অর্থ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চারগুণ। পিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌরবিদ্যুতের চুক্তি বাজারদরের চেয়ে ৭০-৮০ শতাংশ বেশি, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের খরচ ৪০–৫০ শতাংশ বেশি এবং বিনা টেন্ডারের গ্যাস প্রকল্পে বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৪৫ শতাংশ বেশি।

কমিটির হিসাবে, অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে বছরে ৯০ কোটি থেকে ১১৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ঘাটতি সামাল দিতে গেলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা শিল্পখাতকে ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবে।

আদানির বাড়তি বোঝা

২০২৪ সালের হিসাবে আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ ৪-৫ টাকা বেশি পড়ছে। এর একটি অংশ কয়লার দাম হলেও বড় অংশ এসেছে একতরফা শর্ত, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, কর ও ঝুঁকি সরকারের ওপর চাপানোর কারণে।

চুক্তিতে থাকা ‘টেক-অর-পে’ শর্তের কারণে বিদ্যুৎ না নিলেও পুরো অর্থ দিতে হচ্ছে। ডলারের সঙ্গে দাম যুক্ত থাকায় মুদ্রাস্ফীতি ও কয়লার দামের ওঠানামা সরাসরি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ভারতের কোনো রাজনৈতিক বা আইনগত পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে।

এ বিষয়ে রোববার আদানি এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা এখনও জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন পায়নি। বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি।

এ কারণে প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সামিট ও এসএস পাওয়ারের কারণে ‘আর্থিক ঝুঁকি’

প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অসম চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও পিডিবিকে বছরে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ দিতে হচ্ছে ওই কোম্পানিকে।

অন্যদিকে বাঁশখালীর এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্রকল্পে এক মাসেই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছিল ৩৯২ কোটি টাকা। ২৫ বছরে এর পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১.১৭ ট্রিলিয়ন টাকা। ২০২৪ সালের জুনে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ দাঁড়িয়েছে ১৬.২৬ টাকা, যা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের গড় খরচের দ্বিগুণেরও বেশি।

যা সুপারিশ করেছে কমিটি

বিদ্যুৎ খাতের চলমান আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধে জাতীয় কমিটি একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব চুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

একই সঙ্গে উচ্চব্যয় ও অসম বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেসব চুক্তিতে ব্যবহারের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট রয়েছে এবং যেগুলো বৈদেশিক মুদ্রার হারের সঙ্গে সম্পর্কিত সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ভবিষ্যতে নতুন কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি একটি স্বাধীন জ্বালানি তদারকি ও তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। তাদের মতে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জাতীয় কমিটি সতর্ক করে বলেছে, আদানির মত বড় ও ‘অসম’ বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো চ্যালেঞ্জ বা বাতিল করা হলে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে দেশে বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে।

এ বাস্তবতা মাথায় রেখে কমিটি জনমত তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে এবং আগামী ২৫ বছরের জন্য এসব ‘অভিশপ্ত’ চুক্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।

কমিটির মতে, তা না হলে উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের চাপ শিল্পায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ