রাজশাহীতে গেল দুবছরে কমেছে সরিষার আবাদ
স্থানীয়ভাবে ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে চাষিরা নেমেছিলেন সরিষা চাষে। গেল কয়েক বছরে সরিষা চাষ কয়েকগুন বেড়ে যায়। তবে গেল দুই বছরে আবাদ কমেছে। চাষাবাদ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কৃষি বিভাগ বলছে, চাষিরা আমন ধানের পর শীতকালীন সবজি চাষ করেছিলেন। কেউ বা আবার বোরোর বীজতলা আর জমি প্রস্তুত করেছিলেন।
চাষিরা জানান, সরিষা আবাদে খরচের তুলনায় তিনগুণ লাভ হয়। বিঘা প্রতি সরিষা আবাদে খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। ফলন হয়েছে ১০ থেকে ১১ মণ সরিষা। বর্তমানে কাঁচা সরিষার বাজার মূল্য প্রতি মণ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। শুকনো সরিষা ৩হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এতে বিঘা প্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছরে জেলায় সরিষার আবাদ করা হয়েছিল ৫৫ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সরিষা চাষ হয়েছিল ৬৫ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে। সরিষা উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ১১ হাজার ২১৬ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সরিষার আবাদ রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর আবাদ হয়েছিল ৭৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে।
সরিষা উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে সরিষা চাষ হয়েছিল ৪২ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৬৯ হাজার ৭৫৮ মেট্রিক টন সরিষা। আর ২০২১-২২ অর্থ বছরে সরিষা চাষ হয়েছিল ২৬ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৪০ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন সরিষা।
গোটা শীতকালে সবুজ সরিষার গাছে ও হলুদ ফুল ফুটে থাকতো। বসন্তকালে মাড়াই করা হয় সরিষা। এরপর এই সরিষা চলে যায় হাটে। কয়েক বছর দাম নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন চাষিরা। এই বছরও তার ব্যতিক্রম না। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ এবং সঠিক পরিচর্যার ফলে সরিষার এবারও ভালো ফলন হয়েছে। এতে হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে।
কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন এগিয়ে চলেছে কৃষি। আগে গরু বা লাঠি দিয়ে সরিষা মাড়াই করা হতো। এখন মেশিনের মাধ্যমেই মাড়াই করা হচ্ছে সরিষা। এতে আগের তুলনায় সরিষা আবাদ কৃষকদের কাছে সহজ হয়ে উঠেছে।
চাষিরা বলছেন, বেশির ভাগ জমি বোরো আবাদের জন্য প্রায় তিন মাস পড়ে থাকত। কিন্তু এই জমিগুলোকে ফেলে না রেখে সরিষা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। এতে বছরে তারা আমন, সরিষা ও বোরো আবাদ করতে পারছেন। সরিষার ব্যাপক ফলন ও দামে সন্তুষ্টও তারা।
পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামের কৃষক মঞ্জুরুল ইসলাম এবার ১০ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। সরিষার ফলনও হয়েছে ব্যাম্পার। তিনি বলেন, বর্তমানে সরিষা আবাদ করতে তার বিঘা প্রতি সর্বমোট খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি ফলন হয়েছে ১০ থেকে ১১ মণ সরিষা। যার বিঘা প্রতি বর্তমান মূল্য ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এই ফসলের খরচ কম ফলনও ভালো। বছরে তিনটা ফসল করতে পারছি। তাতে মোটামুটি ভালোই লাভ হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলার চাষি আবু তাহের বলেন, বোরো আবাদের আগে এই জমিগুলো আমাদের ফেলে রাখতে হয়। কিন্তু এখন ফেলে না রেখে আমরা সরিষার চাষ করছি। এবার অন্যান্য বারের তুলনায় এবার সরিষার ভালো চাষ হয়েছে। সরিষার দাম ও ফলনে আমরা সন্তুষ্ট।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, গেল দুই বছরে রাজশাহী জেলায় সরিষা চাষ কমেছে। এর কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। যে জমিতে চাষ হয়েছে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে কৃষকরা দামও ভালো পাচ্ছেন, লাভবান হচ্ছেন। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হলে এবং আগামীতে সরিষার আবাদ আরও বাড়বে।