শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

রাজশাহী বিভাগের ১০ উপজেলায় দেওয়া হবে হামের টিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন
রাজশাহী বিভাগের ১০ উপজেলায় দেওয়া হবে হামের টিকা

রাজশাহী বিভাগের ২৬টি এলাকায় সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।  এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগের ১০টি উপজেলায় রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে টিকা দেওয়া শুরু হবে। এজন্য নেওয়া হয়েছে প্রস্তুতি। যে সকল এলাকায় প্রাদুর্ভাব বেশি সেগুলোতে টিকা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় দেওয়া শুরু হবে।   

রাজশাহী বিভাগের ১০টি উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া হবে। এর মধ্যে আছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, সদর ও ভোলাহাট নাটোর সদর, নওগাঁর পোরশা,; পাবনার ঈশ্বরদী, সদর, আটঘরিয়া ও বেড়া।  রাজশাহীতে আগে থেকেই মজুদ থাকা ৩৮ হাজার ৫৯০ ডোজ টিকা দিয়েই কার্যক্রম শুরু হবে। এবার ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।


স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে, সেগুলোকে প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে ধরা হচ্ছে। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের ২৬টি এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই ৬ মাসের কম বয়সী শিশু হলেও বড়রাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। 


বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ৫২০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।


এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়েছে পাবনায় (১০টি এলাকা)। এছাড়া রাজশাহীর ৬টি (মহানগরে ৫টি), নওগাঁর ৫টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩টি এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জের একটি করে এলাকায় হাম ছড়িয়েছে।


চিকিৎসকদের মতে, হাসপাতালে ভর্তি অধিকাংশ শিশুর বয়স ৬ মাসের নিচে। প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। তবে শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালে ৫০ বছর বয়সী এক রিকশাচালকসহ কয়েকজন বড় রোগীও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন,  প্রতিদিনই বাড়ছে হামের রোগী। শনিবার সকাল পর্যন্ত এখানে ১৪৯ রোগী ভর্তি ছিল। রোগীদের জন্য ৪০ শয্যার একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু ওয়ার্ডগুলোতেও আলাদা আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পুরো ওয়ার্ডকেই আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তরের প্রস্তুতি রয়েছে। 


তিনি আরও বলেন, শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) বেড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি বেড হামের রোগীদের জন্য বরাদ্দ বলেও জানান তিনি। এছাড়া তিনি জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের পিআইসিইউ সেবা নিশ্চিত করতে রাজশাহীর হার্ট ফাউন্ডেশনেও রোগী পাঠানো শুরু হয়েছে। রোগী সেখানে থাকলেও চিকিৎসা দিচ্ছে রামেক হাসপাতাল।


রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. শাহীদা ইয়াসমিন জানান, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে রাজশাহী ছাড়াও রংপুর ও খুলনা বিভাগের শিশুরাও রয়েছে। জানুয়ারিতে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের ১০ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার চালু করা হয়েছে এবং একটি পুরো ওয়ার্ড হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত।


তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই ৬ মাসের কম বয়সী শিশু, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে বিদ্যমান আইসোলেশন ব্যবস্থায় চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফএএম আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, নতুন করে হাম-রুবেলা টিকা সরবরাহ না এলেও নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে বেশ কয়েকটি উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া শুরু হচ্ছে। এরপর সিটি করপোরেশনও আসবে। তখন দেওয়া হবে। অভিভাবকদের সচেতন থাকার পাশাপাশি শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে হবে। 


রামেকের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহম্মেদ বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। যা শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। এতে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। সুস্থ হওয়ার পরও পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।


তিনি আরও বলেন, সময়মতো চিকিৎসা ও কার্যকর আইসোলেশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং যথাযথ আইসোলেশন বজায় রাখতে না পারা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 


বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, হাম করোনার মতো ছড়িয়ে পড়বে না। কারণ করোনার সময় আমাদের হাতে টিকা ছিল না। এখন শুরুতেই টিকা আছে। টিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রমণ কমাতে পারলে ৬ মাসের নিচের শিশুরাও আক্রান্ত হবে না। 


তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে, সেগুলোকে আউটব্রেক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় টিকাদানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। উপজেলা পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা তৈরি করা হয়েছে। আশা করা যায় শতভাগ সফল হওয়া যাবে।