রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারতীয় গরুর চাপে স্থানীয় খামারিরা!

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৮ মে ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৮ মে ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারতীয় গরুর চাপে স্থানীয় খামারিরা!

কোরবানির ইদকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম গবাদিপশু উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে একদিকে যেমন পশুর সরবরাহে স্বস্তি রয়েছে, অন্যদিকে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে ভারতীয় গরু প্রবেশের অভিযোগে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় খামারিরা। বাজারে দেশি গরুর চাহিদা থাকলেও অবৈধভাবে আসা গরুর কারণে দাম কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।


সরেজমিনে জেলার কানসাট, তরতিপুর ও সোনাইচন্ডি পশুহাট ঘুরে দেখা যায়, দেশি গরুর পাশাপাশি ভারতীয় জাতের গরুও বিক্রির জন্য আনা হয়েছে। খামারিদের অভিযোগ, এসব গরু চোরাই পথে প্রবেশ করে বাজারে আসায় দেশি গরুর ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করা গরু বিক্রি করেও প্রত্যাশিত লাভ তো দূরের কথা, অনেকেই লোকসানে পড়ছেন।


শিবগঞ্জ উপজেলার আটরশিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি কামাল উদ্দিন জানান, সব সঞ্চয় খরচ করে খামার গড়ে তুললেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি হতাশ। তিনি বলেন, ভারতীয় গরু আসার কারণে আমার বড় গরুটি এক লাখ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। হাটে নিতে পারলে আরও ভালো দাম পেতাম। কিন্তু পথে নানা হয়রানির শঙ্কাও থাকে।


একই উপজেলার কালুপুর গ্রামের খামারি জাহিদ হাসান জানান, বাজারে ক্রেতারা কম দাম প্রস্তাব করছেন। তার ভাষ্য, খাদ্যের দাম বেড়েছে, কিন্তু গরুর দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। তিনটি গরু বিক্রি করলেও প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে।


খামারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায়ও চাপ বাড়ছে। কালুপুরের একটি খামারের শ্রমিক তারেক রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কম। খাদ্যের দাম বেড়েছে, গরমে রোগবালাইও বাড়ছে। তার ওপর ভারতীয় গরু আসায় বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে।


জেলার অন্যতম বড় খামার মালিক মো. আশরাফুল আলম রশিদ সরকারের সহায়তা দাবি করে বলেন, তাপদাহে পশুর পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, টিকার সংকট রয়েছে। এই অবস্থায় বাইরে থেকে গরু আসলে আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়ব।


তবে সরকারি তথ্য বলছে ভিন্ন চিত্র। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার পশু, যেখানে স্থানীয় চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব।


এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. শারমিন আক্তার বলেন, আমাদের নিজস্ব উৎপাদন দিয়েই জেলার চাহিদা পূরণ সম্ভব। বাইরে থেকে গরু এলে স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।


৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রাতের অন্ধকারে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু সীমান্ত পেরিয়ে আনার চেষ্টা হলেও সেগুলো দ্রুত জব্দ ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দুর্গম এলাকা ও নদীপথে অতিরিক্ত টহল, চেকপোস্ট ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।


এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা-এর সীমান্তবর্তী এলাকায় গত সোমবার (১১ মে) রাত প্রায় পৌনে ১টার দিকে অভিযান চালিয়ে চারটি ভারতীয় গরু জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মঙ্গলবার সকালে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন। একইসঙ্গে জানানো হয়, চলতি মে মাসে তাদের দায়িত্বাধীন সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযানে মোট ৩৩টি গরু জব্দ করা হয়েছে।


অন্যদিকে গত ৯মে ভারতে গরু আনতে গিয়ে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। তার অর্ধগলিত লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে। 


উল্লেখ্য, দেশের পশুসম্পদ খাত এখন আত্মনির্ভরতার পথে এগোলেও সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ না হলে এই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোরবানির ইদ সামনে রেখে বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্য মূল্য এবং খামারিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।