শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

রাজশাহীতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের উৎপাদন

জাহিদ হাসান পলাশ ০৭ জুলাই ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন কৃষি
জাহিদ হাসান পলাশ ০৭ জুলাই ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের উৎপাদন

সবুজ পাটগাছের সারি এখন মাঠজুড়ে নতুন আশার ছবি আঁকছে। একসময় দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত সোনালী আঁশ পাট আবারও কৃষকের জমিতে ফিরছে সম্ভাবনার ফসল হয়ে। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা, প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারের প্রসার এবং ন্যায্যমূল্যের আশায় কৃষকেরা নতুন করে ঝুঁকছেন পাট চাষে। চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের আবাদ বেড়েছে। এরই মধ্যে মাঠে আগাম জাতের পাট কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। আর দুই সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হবে পাট কাটার কাজ। 


সরেজমিনে সোমবার (৬ জুলাই) সকালে নওহাটা পাটের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে আগাম পাট চাষিরা এবার ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন। এতে কৃষি বিভাগ ও পাট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদী- এ বছর রাজশাহীতে পাট উৎপাদনও গত বছরের তুলনায় বাড়বে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এবার পাটের আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি।


কৃষি বিভাগ জানায়, রাজশাহীতে সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে পাটের বীজ বপন করা হয়। এরপর শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত চলে পাট কর্তন ও জাগ দেওয়ার কাজ। আগাম জাতের পাট জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কাটতে শুরু করেন কৃষকেরা। মাঠের বর্তমান অবস্থা দেখে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা এবং উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে এবার পাটের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদনও আশাব্যঞ্জক হতে পারে। পবা উপজেলার পাটচাষি রবিউল ইসলাম বলেন, তিনি এ বছর ৪ বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। জমিতে পাটের গাছ ভালোভাবে বেড়েছে। আর দুই সপ্তাহ পর থেকেই তিনি পাট কাটতে পারবেন বলে আশা করছেন। তিনি বলেন, “আগাম জাতের পাট বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ করে দেয়।


তবে পাট জাগ দেওয়া, শ্রমিক সংকট ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি পাট চাষে আগ্রহী হবেন।” বাগমারা উপজেলার পাট চাষি মো. সাইদুর রহমান বলেন, এ বছর তিনি ৫ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, “ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি। তবে পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।” চারঘাট উপজেলার পাটচাষি হৃদয় বলেন, তিনি ৩ বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। গত বছরের তুলনায় এবার জমিতে পাটের অবস্থা ভালো। তাঁর মতে, কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী বছর আরও বেশি মানুষ পাটচাষে আগ্রহী হবেন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ বেড়েছে।


উন্নত বীজ, কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, পাট শুধু অর্থকরী ফসল নয়; পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতির জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছরের সম্ভাব্য পাট উৎপাদন ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। সে হিসাবে এবার গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারে প্রতিমণ পাট সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে, আগাম পাটচাষিরা এবার ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।


সরকার পাটচাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ কারণে কৃষকদের মধ্যে পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ বাজারজাত ব্যবস্থা এবং পাটভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণ করা গেলে রাজশাহী দেশের পাট উৎপাদনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে সোনালী আঁশ আবারও রাজশাহীর কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠবে।