গ্রামীণ অঞ্চলে দামের কারণে বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের গ্রামীণ অঞ্চলে নিত্যমূল্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুষ্টিকর খাবার ব্যয়বহুল হওয়ায় স্বল্পআয়ের মানুষ সস্তায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। গ্রামীণ বাজারগুলোতে অস্বাস্থ্যকর ভাজা খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অন্যান্য অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিপত্য চলেেছ। যা খাদ্যাভ্যাসের মান অবনতি হয়ে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
‘চাপের মুখে গ্রামীণ খাদ্যাভ্যাস: দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাসের উপরের প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণাটি গেল ৩ জুলাই ব্রিটিশ জার্নাল অফ নিউট্রিশনে প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকরা দেখেন, প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চলে বসবাস করেও উচ্চব্যয়ের কারণে মানুষ খুব কম পুষ্টিকর খাবার (ফল, শাকসবজি, মাছ, ডিম) এবং তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর পণ্য গ্রহণ করছেন। রাজশাহী, রংপুর, ভারত এবং নেপাল জুড়ে প্রায় ১০ হাজার পরিবার এবং ১ হাজার ৬৪৬টি বাজারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ উনব্লিটিউট (আইএফপিআরাই), ভারতের ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক গ্রোথ এবং নেপালের ইনরিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে গবেষণাটি। গবেষক দলে ছিলেন আইএফপিআরআইয়ের আলকা চৌহান, স্যামুয়েল স্কট, পূর্ণিমা মেনন ও সুমন চক্রবর্তী, ভারতের উইলিয়াম জো এবা নেপালের নন্দ কুমার মারোজন। তবে বাংলাদেশের কোনো গবেষক এই জরিপে ছিলেন না।
জরিপকৃত গ্রামগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বিক্রেতা ছিল। অন্যদিকে, অনেক গ্রামীণ খাদ্য পরিবেশকে ‘খাদ্য জলাভূমি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব গ্রামে অস্বাস্থ্যকর খাবার প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে এর ব্যাপকভাবে প্রচারণাও করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৬০ শতাংশেরও বেশি উত্তরদাতা নিয়মিত খাবারের মাঝে হালকা খাবার খেতেন। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে চিনিযুক্ত পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিজ্ঞাপন তাদের খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করছিল। বাজারের ভৌতিক নৈকট্যের চেয়ে খাদ্যের মূল্য, ক্রয়ক্ষমতা, বিক্রেতার ঘনত্ব এবং খাদ্য প্রচারের প্রভাব খাদ্যাভ্যাসের উপর বেশি ছিল।
খাদ্যাভ্যাসের উন্নতি করতে হলে পুষ্টিকর খাবারকে আরও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করার পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিপণনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে বলে তারা মত দিয়েছেন। এই ধরনের পদক্ষেপ ছাড়া গ্রামীণ খাদ্য পরিবেশের অবনতি খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত রোগের বোঝা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক শাহজাদা সেলিম বলেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার দেশে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিপাকীয় রোগের হার বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। সমস্যাটি শুধু প্যাকেটজাত খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অতিরিক্ত শর্করা-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, রান্নার তেলের বারবার ব্যবহার এবং খাদ্য ও পরিবেশগত দূষকের সংস্পর্শও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, মানুষ ক্রমবর্ধমানভাবে চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে। যা স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, প্লাস্টিক থেকে প্রাপ্ত রাসায়নিক এবং দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত প্রভাবের স্বাস্থ্যগত ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরের ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার অভাব থাকায় তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিক বিভাগের চেয়ারম্যাান অধ্যাপক এএইচএম আক্তারুজ্জামান বলেন, শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটিলিভার ডিজিজ এবং ডায়াবেটিস উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ফ্যাটি লিভার থেকে ফাইব্রোসিস ও সিরোসিস হতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ রক্তচাপ পরবর্তী জীবনে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তিনি এই প্রবণতার কারণ হিসেবে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, স্কুলের আশেপাশে ফাস্ট-ফুডের দোকানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং শিশুদের শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়াকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, খাদ্যাভ্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন প্রায় প্রতিটি স্কুলের কাছেই ফাস্ট-ফুডের দোকান দেখা যায়, অন্যদিকে খেলাধূলা ও ব্যায়ামের সুযোগ কমে আসছে।
ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথ নিউট্রিশনের পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, আগ্রাসী বিপণন, সহজলভ্যতা এবং ভোক্তাদের পরিবর্তিত পছন্দ মানুষকে স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবর্তে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য গ্রহণে উৎসাহিত করছে। পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই উদ্বেগের বিষয়। এর জন্য বৃহত্তর জনসচেতনতা প্রয়োজন।