রাজশাহীতে ‘সোনালী আঁশে’ সুদিন, পাটের চড়া দামে হাসি কৃষকের মুখে
এক সময় পাটের আঁশ ছাড়াতে কৃষকের ঘামে ভিজত মাঠ, আর বাজারে গিয়ে সেই পাটের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মুখ ভার করে ফিরতে হতো তাঁকে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও দাম না বাড়ায় ‘সোনালি আঁশ’ নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছিলেন অনেক কৃষক। সেই চিত্র এবার কিছুটা বদলেছে। পাটের ভালো ফলনের সঙ্গে বাজারে মিলছে কাক্সিক্ষত দাম। ফলে রাজশাহীর ফসলের মাঠে মাঠে সবুজ পাটের সমারোহের পাশাপাশি কৃষকের মুখেও ফুটেছে স্বস্তির হাসি। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ বেড়েছে। আগাম জাতের পাট ইতোমধ্যে কেটে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ শেষ করেছেন অনেক কৃষক। শুকনো পাট নিয়ে তাঁরা ছুটছেন স্থানীয় হাটে। সেখানে নতুন পাটের প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, মৌসুমের শুরুতেই গত বছরের তুলনায় এবার পাটের দাম বেশি।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে পবা উপজেলার নওহাটা হাটে গিয়ে দেখা যায়, অল্প পরিমাণে নতুন পাটের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। কৃষকেরা মাথায়, ভ্যানে ও ভুটভুটি বা নসিমনে করে পাট নিয়ে আসছেন। দরদাম করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন তাঁদের উৎপাদিত পাট।
পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাবলু আহমেদ এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় প্রায় ১১ মণ করে পাট পেয়েছেন। নওহাটা হাটে চার মণ পাট প্রতি মণ সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে ১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এর আগে একই দামে আরও আট মণ পাট বিক্রি করেছেন। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে বলে জানান তিনি।
নওহাটা বাজারের পাট ব্যবসায়ী জানিপ হোসেন বলেন, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় কেনা হয়েছিল। এবার মৌসুমের শুরুতেই সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে পাট কিনতে হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার পাটের বাজারদর কিছুটা বেশি।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকেরা এখন পাট কাটা নিয়ে ব্যস্ত। কোথাও শ্রমিকেরা দল বেঁধে পাট কাটছেন, কোথাও কাটা পাট আঁটি করে জমিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও চলছে জাগ দেওয়ার প্রস্তুতি। পাট কেটে দ্রুত জমি প্রস্তুত করে আমন ধান রোপণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন কৃষকেরা। ফলে একদিকে পাট কাটার ব্যস্ততা, অন্যদিকে আমন চাষের প্রস্তুতি-দুই কাজেই ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক।
পবা উপজেলার বড়গাছী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আলীম বলেন, এক বিঘা বা ৩৩ শতাংশ জমিতে পাট চাষে তার প্রায় ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান বাজারদর প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা হিসাবে ১০ মণ পাট বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে এক বিঘায় প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ থাকবে। তবে পাটের বর্তমান দাম নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও ভবিষ্যৎ বাজারদর নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় আছেন কৃষকেরা। কৃষক আব্দুল আলীম বলেন, এখনো অনেক পাট জাগ দেওয়া বাকি। মৌসুমের ভরা সময়ে বাজারে একসঙ্গে বেশি পাট উঠলে দাম কমে যেতে পারে। তাই বাজারে ভালো দাম কত দিন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পাট চাষের আরেকটি সমস্যার কথা জানিয়েছেন পবা উপজেলার হরিপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ভরা মৌসুমে শ্রমিকের সংকট দেখা দেয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক দূরে নিয়ে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পাটের দাম ভালো থাকায় এই বাড়তি খরচ কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের লাভ আরও বাড়ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জেলায় পাটের আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে তীব্র খরা ও ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকেরা কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরে সময়মতো বৃষ্টি, জ্বালানি সংকটের উন্নতি এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় পাটের ভালো ফলন হয়েছে। বাজারে পাটের বর্তমান ভালো দাম কৃষকদের আগের তুলনায় বেশি লাভবান করবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।
এবিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমএ মান্নান বলেন, বর্তমানে বাজারে নতুন পাটের দাম ভালো থাকায় কৃষকেরা সন্তোষজনক মূল্য পাচ্ছেন। এই দাম যদি মৌসুমজুড়ে স্থিতিশীল থাকে, তাহলে পাট চাষ করে কৃষকেরা ভালো লাভ করতে পারবেন। এতে আগামী মৌসুমে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার বলেন, চলতি বছর রাজশাহীতে সম্ভাব্য পাট উৎপাদন ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। সে হিসাবে এবার গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে আগাম পাট চাষিরা এবার ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন। পাটের ভালো দাম ও বাড়তি আবাদ কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করছে। কৃষকেরা বলছেন, বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে ‘সোনালী আঁশ’ আবারও তাঁদের জন্য লাভজনক ফসলে পরিণত হতে পারে।