বর্ষায়ও ঘনঘন লোডশেডিং
চলছে ভরা বর্ষা। শ্রাবণ মাসের এই সময়ে আকাশে মেঘ থাকছে। মাঝেমধ্যে হচ্ছে বৃষ্টি। তবে থাকছে শীতল আবহাওয়া। বৃষ্টি পুরোপুরি স্বস্তি এনে দিতে পারছে না, তেমনি বাড়ছে লোডশেডিংও। এ কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী থেকে শুরু করে কৃষকসব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর।
একই অবস্থা উত্তর-পশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগগঞ্জেও। ঘন ঘন লোডশেডিং জনজীবনকে প্রায় অচল করে তুলেছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা আরও তীব্র, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, ব্যবসায় ও দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে আমন মৌসুমে সেচ নির্ভর কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় দেখা দিয়েছে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (নেসকো) বলছে, গ্যাসসংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আবারও বাড়ছে লোডশেডিং। অনেক কেন্দ্র উৎপাদন করছে সীমিত সক্ষমতায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২ আগস্ট) রাজশাহীতে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এই ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি না হওয়ার কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে।
এরই মধ্যে দিনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের ভেতর অসহনীয় গরম তৈরি হচ্ছে। ফ্যান ও পানির মোটর বন্ধ থাকায় বাসাবাড়িতে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। রাতের লোডশেডিংয়ের কারণে অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না।
রাজশাহী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু বৃষ্টির পানি পড়তে না পড়তেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এমন সময় অনেক কাজ আটকে যাই, গরমে পড়াশোনায় মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রাতে লোডশেডিং হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়।
দিনের পাশাপাশি রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। রাতের লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ তৈরি করছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য। অতিরিক্ত গরমে অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। আবার যেসব রোগী নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর বা অন্যান্য বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থী নুসরত জাহান বলেন, আমরা যারা পড়াশোনার জন্য বাইরে থাকি তারা প্রায় সবাই কারেন্টের চুল ব্যবহার করে, এখন এইভাবে কারেন্ট না থাকলে আমাদের রান্না করতে অনেক অসুবিধা হয়। ক্লাস, পড়াশোনার মাঝে রান্না সময় মতো না করতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যা হয়।”
বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং বাসা-বাড়ির গৃহিণীরা এই অনিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। বাসা-বাড়িতে আইপিএস কিংবা চার্জার ফ্যান ব্যবহার করেও মিলছে না ত্রাণ, কারণ বারবার লোডশেডিংয়ের ফলে সেসব ডিভাইস পূর্ণাঙ্গ চার্জ হতে পারছে না। বাতাসের চরম আর্দ্রতায় বিদ্যুৎ না থাকলে বয়স্ক ও শিশুদের হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
নগরীর নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমার দোকান খোলা হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। রাত নয়টায় বন্ধ করা হয়। এর মধ্যে ৫ থেকে ৭ বার বিদ্যুত যাওয়া-আসা করে। আমার ব্যবসায়ও ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুত ১ ঘণ্টা করে থাকছে না।
বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সবজিক্ষেতে পানি জমে থাকায় শাকসবজি, মরিচ ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টি না হলেও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে জমির পানি ঠিকমতো শুকাতে পারছে না। এতে গাছের শিকড় পচে যাওয়া, রোগবালাই বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ লোডশেডিং কমানোর জন্য জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোহম্মদ মুশাকে লিখিত আবেদন করেছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তাদের জানান বিষয়টি শীঘ্রই যথাযথ কতৃপক্ষ কে অবহিত করবেন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিন-রাত মিলিয়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ঘটছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, এই সময় জমিতে নিয়মিত পানি দিতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বারবার চলে যাওয়ায় পাম্প চালানো যাচ্ছে না। ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। একই চিত্র শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলেও, যেখানে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে সেচ কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। পৌরসভার আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বাবু জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার ভয় আছে। ক্লাব সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল আজিম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকান চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে ক্রেতারা আসলেও বেশিক্ষণ থাকেন না, বিক্রি কমে গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে, যা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোহামিনুর রহমান জানান, জেলায় চাহিদা ৪০/৪৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট। ফলে ১০/১৫ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো. ফজলুর রহমান বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আমন ধান চাষের জন্য গ্রামাঞ্চলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকট একটি বহুমাত্রিক সমস্যার প্রতিফলন। একদিকে তাপপ্রবাহজনিত বাড়তি চাহিদা, অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেচনির্ভর কৃষির ওপর বাড়তি চাপ, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমন মৌসুমে সেচে সামান্য ব্যাঘাতও ফলনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সময়মতো পানি না পেলে ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
নবাব অটো রাইস মিল ও হক অটো রাইস মিল মালিকরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে চাল উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। একদিকে বেড়ে যাচ্ছে খরচ অন্যদিকে উৎপাদন কম হওয়ায় দৈনন্দিন খরচ বাড়ছে। তারা দ্রুত বিদ্যুৎ লোডশেডিং কমানোর দাবি করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষিখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প শক্তির উৎস, যেমন সৌরবিদ্যুৎ নির্ভর সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে লোডশেডিং এখন শুধু সাময়িক ভোগান্তি নয়, এটি কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী জিয়াউল ইসলাম বলেন, আমরা জাতীয় গ্রিড থেকে যেটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছি তা দিয়ে দিচ্ছি। এর মধ্যে লোডশেডিং হচ্ছে। গেল কয়েকদিন লোডশেডিং বেড়েছে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ স্বাভাবিক হলে এই সমস্যা আর থাকবে না।