দ্রোহের মিছিলে রাজশাহী ছিল উত্তাল
শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাত রাজশাহী। সারা দেশের মতো রাজশাহীতেও অসহযোগ আন্দোলন। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এক দফা ঘোষণার পর রাজশাহীর চিত্র পরিবর্তন হতে থাকে। সব শ্রেণিপেশার মানুষ যোগ দেন এই আন্দোলনে। রাজশাহীতে প্রায় প্রতিদিন মিছিল হতো। রাজশাহীর এই আন্দোলন ছিল অহিংস।
২৪ এর আগস্টের শুরু থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের দখলে ছিল রাজপথ। যদিও দিন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাঠে ছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে মুখোমুখি হননি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার চলে যাওয়ার আগ মুহুর্তে রাজশাহীতে শুরু রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষ।
সে সময়ে আন্দোলনকারীদের মোকাবেলা করতে তারা রাজশাহী মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা নগরজুড়ে টহল দেন। পুরো রাজশাহীজুড়েই সে সময় ছিল থমথমে।
সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে মাঠে নেমেছিলেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। এসব ঠেকাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছিলেন। সরাসরি মাঠে মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা নেমেছিলেন।
সরকার পতনের আগ মুহুর্তে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) প্রধান ফটকের সামনে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ও নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, জামায়াত, বিএনপির নেতাকর্মীরাও মাঠে ছিলেন। নারীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন তারা। ১২টা নাগাদ সরকার পতনের একদফা দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা। পাশেই বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান করলেও তারা কর্মসূচিতে বাধা দেননি তবে তারা নজরদারি করছিলেন।
বিক্ষোভকারীরা সেখানে অবস্থান নিয়ে ‘আমার ভাই মরলো কেন, শেখ হাসিনা জবাব দে’; ‘এক দফা এক দাবি, শেখ হাসিনা কখন যাবি’; ‘আওয়ামী লীগের চামড়া, তুলে নেবো আমরা’; ‘হইহই রইরই, ছাত্রলীগ গেলি কই’; ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরো দেবো রক্ত’; ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’; ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’সহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনে আসা অনেকের হাতে লাঠি আর মাথায় পতাকা বাঁধা ছিল।
আন্দোলনকারীরা রুয়েট গেট থেকে বিক্ষোভ করতে করতে সাহেববাজারের দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। অপরদিকে কুমারপাড়া এলাকায় দেশীয় অস্ত্রসহ অবস্থান নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের নিয়ে নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মাঠে ছিলেন। আন্দোলনকারীদের বিশাল এই মিছিল
আলুপট্টি এলাকার কাছাকাছি এসে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। একপর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ককটেল বিস্ফোরণ হয়। এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত এ সংঘর্ষ চলে।
পরে আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে থাকেন। বেলা দেড়টার দিকে তারা তালাইমারী-আলুপট্টি সড়ক ছেড়ে চলে যান। এ সময় আওয়ামী লীগের লোকজন ধাওয়া দিলে সাকিব আনজুম নগরীর পঞ্চবটি এলাকার একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। হামলাকারীরা ওই বাড়িতে ঢুকেই সাকিবকে কুপিয়ে হত্যা করেন। তার কাছে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে স্থানীয় লোকজন পরিচয় শনাক্ত করেন।
শেখ হাসিনার পতনের ঠিক আগ মুহুর্তে রাজশাহীতে ঝড়ে রক্ত। সেদিন হাসপাতালে হামলায় আহত হয়ে ৪০ জন ভর্তি হন। তাদের মধ্যে ৩০ জন ছিলেন গুলিবিদ্ধ। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হওয়ার চারদিন পর রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক আলী রায়হান (২৮) মারা যান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মিশকাত চৌধুরী মিশু বলেন, আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমরা অসহযোগ ও সরকার পতনের এক দফায় সবাইকে সংগঠিত করছিলাম। আমাদের পাশেই মোতায়েন থাকা পুলিশ সদস্যদেরও আমাদের সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহবান জানিয়েছিলাম। আন্দোলনে সেদিন পুলিশ বাধা দেয়নি। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার পতনের এক দফা ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। রাজশাহীতে সরকার পতনের আগ মুহুর্তে এসে রক্ত ঝড়েছিল। আমরা তাদের কখনই ভুলবো না।
শেখ হাসিনা পদত্যাগ পর থেকেই রাজশাহীতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘরবাড়ি ও দলীয় কার্যালয় থেকে সব জিনিসপত্র লুট করার পর দরজা-জানালা এমনকি ইটও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার (৫ আগস্ট) বিকাল থেকে নগরীতে অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। লুটপাট কওে জ¦ালিয়ে দেওয়া হয় রাজশাহী নগর পুলিশের (আরএমপি) সদর দফতর ও বিভিন্ন থানা।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দশতলা ভবনের নিচতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি কক্ষের এসি, ফ্যান, কম্পিউটারসহ অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
আরএমপির সদর দফতরে পাঁচটি গাড়ি ও কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। দোতলায় পুলিশ কমিশনারের কক্ষে টেবিল ছাড়া আর কিছু ছিল না। সিসিটিভির মনিটরগুলোও নিয়ে যাওয়া হয়। সাইবার ক্রাইম ইউনিট পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
তবে বাদ যায়নি গণমাধ্যমও। নগরীর উপশহর এলাকায় দৈনিক সোনার দেশ থেকে সবকিছু লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকার নিবন্ধিত অনলাইন পদ্মাটাইমের অফিসেও চালানো হয় লুটপাট। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সিল্কসিটি নিউজের অফিসও।