চলছে আমন রোপন, নির্ধারিত দামেও মিলছে না সার
রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে আমন রোপনে কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামের পথে পথে শুরু হয় কৃষকদের কর্মযজ্ঞ। কেউ কাঁধে ধানের চারা, কেউ ট্রাক্টর নিয়ে জমি প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত। আবার কোথাও নারী-পুরুষ একসঙ্গে কোমর পানিতে নেমে সারিবদ্ধভাবে আমনের চারা রোপণ করছেন। রাজশাহীর গ্রামীণ জনপদজুড়ে এখন আমন রোপণের ব্যস্ততা। কিন্তু আমন রোপনের মধ্যেও নির্ধারিত দামে মিলছে না সার। ভর্তুকির সারও লাগালের বাইরে চলে গেছে কৃষকদের।
আমন মৌসুমে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়েও কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। তবে অনুমোদিত ডিলাররা দাবি করছেন, সরবরাহ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অনুমোদিত ডিলারের কাছে ভর্তুকির সার পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা প্রকাশ্যে চড়া দামে সেই একই সার বিক্রি করছে।
সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি ১৩৫০ টাকায় এবং ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ১০৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে কৃষকরা বলেছেন, অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে সরবরাহ না পাওয়ায় তারা টিএসপির জন্য ১৭০০-১৮০০ টাকা এবং ডিএপির জন্য প্রায় ১৬০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা দোকান খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মজুত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। এবং তারা ক্যাশ মেমো দিতে অস্বীকার করছেন।
পবা উপজেলার বড়াইকুড়ি গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেন বলেন, আমার কৃষি কার্ড আছে। কয়েকবার অনুমোদিত ডিলারের কাছে গিয়েও সার কিনতে পারেনি। সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশি দাম দিতে রাজি থাকলে কোনো ঘাটতি নেই।
নওহাটা বাজারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে কোনো ভর্তুকির সার পাওয়া যায়নি। দোকান মালিক ও ডিলার আব্দুল হক বলেন, ৪২টি মৌজাজুড়ে কয়েক হাজার কৃষককে সার সরবরাহ করতে হচ্ছে। জুলাই মাসে মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা মিউরেট অফ পটাশ বা এমওপি এবং ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছেন। এই সার দুই তিনদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনস্থ আরেকটি অনুমোদিত ডিলার তাসনিম এন্টারপ্রাইজের কর্মচারি জানান, আমাদের সারের মজুত ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। তবে পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে দোকান মালিক ফজলুর রহমান দাবি করেন, যে সার ছিল।
অনুমোদিত ডিলারের পাশের একটি খুচরা দোকানে একজন কর্মচারি ৫০ কেজি এক বস্তা ডিএপি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫৫০ টাকা বেশি দামে অর্থাৎ ১৬০০ টাকায় বিক্রি করার প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার দাবি, ভর্তুকির সার তিন-চারজন মধ্যস্থতাকারীর হাত ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে আমন চাষের জন্য মোট ৪ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে ইউরিয়া ছাড়া তিনটি প্রধান সারেরই বরাদ্দ ২০২৫ সালের মাসগুলোর তুলনায় বেশি পেয়েছে। জেলায় টিএসপি, ডিএপি এবং এমওপির বরাদ্দ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বরাদ্ধ ছিল ৫৮৭৬ টন। ২০২৬ সালেতা ৭,০৩৩ টন হয়েছে। আগস্ট মাসের বরাদ্দও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে টিএসপি ১৪৩০ টন থেকে বেড়ে ১৫১১ টন, ডিএপি ২৪০৪ টন থেকে বেড়ে ২৬৪৭ টন এবং এমওপি ১৭০৯ টন থেকে বেড়ে ১,৭৬০ টন হয়েছে। নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও বেশি বরাদ্দ মিলেছে। অন্যদিকে নাটোর জেলায় সামান্য হ্রাস রেকর্ড করা হয়েছে।
বিএডিসি রাজশাহী শাখার সহকারী পরিচালক (সার). নাসির উদ্দিন বলেন, বিএডিসি কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত পরিমাণ অনুযায়ীই কঠোরভাবে সার বিতরণ করেছে। আমরা শুধু মন্ত্রণালয় কর্তৃক বরাদ্দকৃত পরিমাণই সরবরাহ করি। কিছু কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি সার প্রয়োগ করায় মৌসুমী চাহিদা বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপ-পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, সারের ঘাটতি নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে সব যায়গায় আমন রোপন চলছে। কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। আশাকরি এবারও আমনের ফলাফল ভালো হবে।
জেলা সার বিতরণ কমিটির প্রধান এবং রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সারের দাম বেশি এই অভিযোগ কোন কৃষক করেনি। তবে আমি এই বিষয়ে খোঁজ নেব। বিষয়টি তদন্ত করা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।