শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

রাজশাহীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৩০টি মামলায় প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ২১টির

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন বিশেষ প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৩০টি মামলায় প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ২১টির

২০২৪ সালে রাজশাহীতে টানা ৩৫ দিন অহিংস আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। কিন্তু শেষ দিনে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন তরুণ শিক্ষার্থী সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান। আহত হয়েছিলেন বহু আন্দোলনকারী। সেই ঘটনার পর দায়ের হয় ৩০টি মামলা। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যে ২১টি মামলা তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। কয়েকটি মামলার তদন্ত চলমান আছে। 


সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, মামলাগুলোর মধ্যে কোনোটির তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষা, কোথাও চার্জশিট জমা হলেও শুরু হয়নি বিচার। নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই তাদের ক্ষতকে আরও গভীর করা। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তড়িঘড়ি নয়, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোচ্ছে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন।


সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়েও বিচারিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধারা। তাদের অভিযোগ, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অভিযুক্তদের প্রতি এক ধরনের প্রশ্রয় তৈরি করছে এবং এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কষ্ট আরও বাড়ছে।


তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অভাব, নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকের সাক্ষ্য দিতে অনীহা এবং পর্যাপ্ত ভিডিও ফুটেজ ও ফরেনসিক আলামত সংগ্রহে জটিলতার কারণে তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে।


পুলিশ বলছে, আরও দুটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই সেগুলোর প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে। এ পর্যন্ত যেসব মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রায় আড়াই হাজার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬ শতাধিক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 


৫ আগস্ট দুপুরে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব আঞ্জুম নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একটি বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর সেখানেই তিনি মারা যান। একই ঘটনায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী এবং রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক আলী রায়হান। চার দিন পর ৮ আগস্ট হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই দুই মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, রাজশাহীর জুলাই আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।


সাকিব আঞ্জুমের বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোবে। কিন্তু দুই বছর পার হলেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। আদালত, তদন্তÑসবকিছু যেন খুব ধীরগতিতে চলছে। আমাদের পরিবার কোনো প্রতিশোধ চায় না, আমরা শুধু আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই। যারা অপরাধ করেছে, তারা যেন আইনের আওতায় এসে শাস্তি পায়Ñএটাই এখন আমাদের একমাত্র দাবি।


সাকিবের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, আমার ছেলেকে তো আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার হলে অন্তত একজন মা হিসেবে কিছুটা শান্তি পাব। দুই বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করছি। প্রতিটি দিন আমাদের কাছে কষ্টের। রাষ্ট্র যদি শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হবে খুনিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা।


রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ আলী রায়হানের ভাই রানা ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু আজও আমরা সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না। মামলার চার্জশিট হলেও বিচারিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, শুধু আমাদের পরিবারের জন্য নয়, জুলাই আন্দোলনে নিহত প্রত্যেক মানুষের পরিবারের জন্য দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।


জুলাই আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়ক এবং ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক  মেহেদী সজীব বলেন, আন্দোলনে অনেকেই জীবন দিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। বিচার বিলম্বিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ভুল বার্তা যাবে।


আরএমপির মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং ভিডিও ফুটেজে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই এসব মামলার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) সবসময় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি, তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি সহযোগিতা দিতে আরএমপি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।


রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলী আশরাফ মাসুম বলেন, আমাদের মহানগর দায়রা জজ আদালতে বেশ কয়েকটি বিচারিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় বিচারিক কার্যক্রম কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে বর্তমানে মামলাগুলোর কার্যতালিকা অনুযায়ী শুনানি গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, যেসব মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলোর বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।


রাজশাহীর অধিকাংশ মামলায় আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রাজশাহীর সাবেক সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আলোচিত হত্যা মামলায় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।