রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

শখের হাঁড়িতে বাঙালির লোকঐতিহ্য, সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে পবার মৃৎশিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৫ অপরাহ্ন
শখের হাঁড়িতে বাঙালির লোকঐতিহ্য, সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে পবার মৃৎশিল্প

মাটির হাঁড়ি, গায়ে রঙিন আঁচড়। মাছ, পাখি, পদ্ম কিংবা চিরুনির নকশায় ফুটে ওঠে গ্রামীণ জীবনের গল্প। পবা উপজেলার বসন্তপুর ও উলাপুরের কারিগরদের হাতে তৈরি শখের হাঁড়ি তাই শুধু মাটির পাত্র নয়, বাঙালির লোকঐতিহ্যেরও এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তবে কাঁচামালের সংকট ও বাড়তি খরচে সেই ঐতিহ্য এখন চাপে। এই সংকট কাটিয়ে মৃৎশিল্পের নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে রাজশাহীর পবায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী কর্মশালা। বুধবার (১২ আগস্ট) দিনব্যাপী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ‘মৃৎশিল্প ও শখের হাঁড়ির ঐতিহ্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক কর্মশালা এবং নকশা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।


কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন। তিনি বলেন, লোক সংস্কৃতি, শিল্প ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই একটি জাতির পরিচয় টিকে থাকে। পবার শখের হাঁড়ি সেই আত্মপরিচয়ের অংশ। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি আয়োজন ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্লাস্টিকের বদলে মাটির নান্দনিক সামগ্রী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুললে অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়বে। এতে পবার শখের হাঁড়ি আরও বড় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক ড. উদয় শংকর বিশ্বাস বলেন, মৃৎশিল্পের সংকটকে শুধু কারিগরদের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না।


মাটির প্রাপ্যতা, খড়ি ও রঙের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে শিল্পীরা চাপে রয়েছেন। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।


কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, বসন্তপুর ও উলাপুরের কারিগরদের তৈরি শখের হাঁড়ি শুধু রাজশাহীর নয়, বাংলাদেশের একটি অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক। ইতিমধ্যে এটি সরকারি স্বীকৃতিতে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা পেয়েছে। এ অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের নৈপুণ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে এবং একজন কারিগর ইউনেস্কোর পুরস্কার পেয়েছেন।


কর্মশালায় শখের হাঁড়ির নকশা ও মানোন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ, আধুনিক নকশা, পণ্যে বৈচিত্র আনা এবং নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের কাছে মৃৎপণ্য আকর্ষণীয় করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা ও পণ্য তৈরি করা গেলে মৃৎশিল্পের বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে। রিসোর্স পারসন ও প্রশিক্ষক ছিলেন চিত্রশিল্পী, লেখক, গবেষক ও কিউরেটর শাওন আকন্দ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উচ্চ বিভাগীয় সহকারী মিজানুর রহমান।


অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, ব্র্যাকের জেলা সমন্বয়ক মহসিন আলী, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফাতেমা খাতুন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ, পবা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী নাজমুল ইসলাম, বাঁচার আশা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা সরকার বিজলী। দিনব্যাপী কর্মশালা শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে সনদ বিতরণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, সহজলভ্য কাঁচামাল, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক নকশা ও কার্যকর বাজারব্যবস্থার সমন্বয় ঘটলে সংকট কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে পবার মৃৎশিল্প। শখের হাঁড়ির রঙে তখন নতুন করে ফুটে উঠতে পারে বাঙালির লোকঐতিহ্যের চিরচেনা গল্প।