সভ্য সমাজে ‘এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন’ সাজা আশা করা যায় না: হাইকোর্ট
ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র দুজনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে। সভ্য সমাজে এই ধরনের ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া রায়, অবিবেচনাপ্রসূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা আশা করা যায় না।
নুসরাত জাহানের হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ জনকে খালাস দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১১২ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়।
হাইকোর্ট বিভাগ বলেন, রায় সমাপ্ত করার আগে আমরা এখানে একটি সতর্কতামূলক মন্তব্য করতে চাই। আমরা দোষী সাব্যস্ত বন্দী মোহাম্মদ শামিম, রুহুল আমিন, মকসুদ আলম কাউন্সিলর এবং আফসারউদ্দিনের বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রমাণ পাইনি, যেখানে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এই ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত সাজার কারণে তারা ৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্জন কনডেম সেলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
১৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে, এখন পর্যন্ত মাত্র দুজনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে। এই ধরনের ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া রায় সেই হতভাগ্য ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর ওপর এক বিপর্যয়কর প্রভাব পড়েছে।
সভ্য সমাজে এই ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা আশা করা যায় না।
হাইকোর্ট বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে বিচারিক সংবেদনশীলতার অভাব দেখা গেছে যার জন্য তাকে দায়রা ও সাজা দেওয়ার নিয়মের মূল বিষয়গুলি না জানা পর্যন্ত দায়রা এখতিয়ারের বাইরে রাখা উচিত। সুতরাং, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগকে উপরোক্ত সংশোধন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিচারককে সেশনের এখতিয়ার থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২৪ আগস্ট বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা (৫৭) এবং শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)।
যাদের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।
১৬ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্য থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কিংবা দণ্ডটি আদালতের দৃষ্টিতে বহাল থাকা উচিত নয় মর্মে ১০ জন ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এই রায়ের পরে আদালত নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যে রায়, সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক যিনি ছিলেন, বিচারক মামুনুর রশীদ, তার সম্পর্কে আদালত বলেছেন, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড প্রদানটা অনেকটা মাইন্ডলেস সেন্টেন্স। অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার পুরোপুরি মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিসিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, তিনি সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এবং তিনি এই জাজমেন্টটা রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কার কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার কী কতটুকু মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং অর্থাৎ ফৌজদারি মামলার বিচার এবং সে ক্ষেত্রে তার দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রকাশ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন তার মা শিরীন আখতার। এই মামলার জের ধরে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তার অনুগত কিছু ক্যাডার জনমত গঠন করে সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য। ৩ এপ্রিল খুনিরা সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা।
ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় সেখান থেকে নুসরাতকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা হয়। একই বছরের ২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ