কানাডার দুগ্ধপণ্য, মদ ও মোটরসাইকেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার স্পিরিটজাতীয় অ্যালকোহল, দুগ্ধজাত পণ্য ও মোটরসাইকেলসহ একগুচ্ছ পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কানাডার পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়াতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বৈষম্যমূলক’ আচরণ করেছে। এই নির্বাহী আদেশের আওতায় আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে চিহ্নিত কানাাডীয় পণ্যগুলোর আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের একটি ‘মাশুল’ কানাডাকে দিতে হবে। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকার মাশুল তার চেয়েও অনেক বেশি।”
মার্কিন ও কানাডীয় কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, আগস্টের শেষের দিকে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে আর কোনো বৈঠকের দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।
হোয়াইট হাইজের এই নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা বাণিজ্য যুদ্ধের সর্বশেষ ধাক্কা। ঐতিহাসিকভাবে মিত্র এই দেশ দুটি একে অপরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার।
সাধারণত কানাডার মোট রপ্তানির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি যায় প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে, মেক্সিকোর পর কানাডাই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বাজার বেশ বৈচিত্র্যময়।
উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা এই বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অনেকেরই ধারণা, এতে পণ্যের দাম বাড়বে ও ক্রেতার সংখ্যা কমবে।
কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর গত মাসে হোয়াইট হাউজ কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
ওই শুঙ্কের প্রভাব পড়ে কানাডার আসবাবপত্র ও ওয়াইন শিল্পের পাশাপাশি খেলনা সামগ্রী ও মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল, পোশাক ও আসবাবপত্রের ওপর একই হারে পাল্টা শুল্ক বসায় কানাডা। মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর থেকে এসব পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়।
মঙ্গলবার নতুন আমদানি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় হোয়াইট হাউজ জানায়, কানাডা অন্য দেশের ওপর কড়াকড়ি না এনে কেবল আমেরিকান পণ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে মার্কিন ব্যবসার সঙ্গে ‘বৈষম্য’ করছে।
ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার কিছু পণ্য যেমন- হুই (দুগ্ধজাত সিরাম) ও অ্যালকোহলমুক্ত বিয়ার আমদানি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। আর পনির ও মোটর বোটসহ অন্যান্য কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক আরও বাড়িয়েছে।
এর আগে সোমবার ট্রাম্প আরও বাণিজ্য কড়াকড়ির ইঙ্গিত দিয়ে কানাডীয় বিমান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘বোম্বার্ডিয়ার’-কে সতর্ক করেন। তিনি জানান, উৎপাদন কারখানা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত না করলে তারা আর সেখানে পণ্য বিক্রি করতে পারবে না।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা কমাতে শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে দেখার পুরোনো বিশ্বাস ট্রাম্পের থাকলেও, তার এই ঢালাও শুল্ক নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ঐতিহ্যবাহী মিত্রকে ক্ষুব্ধ করেছে।
গত বছর ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী শুল্ক যুদ্ধ শুরু করার পর, কানাডার সাধারণ মানুষ অ্যালকোহলের মতো মার্কিন পণ্য ব্যাপকভাবে বয়কট করতে শুরু করে। ফলে কিছু দোকান থেকে আমেরিকান পণ্য একপ্রকার গায়েবই হয়ে গেছে।
হিনরিচ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ডেবোরা এলমস বিবিসিকে বলেন, মার্কিন ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল যেকোনো কানাডীয় ব্যবসার ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ‘ব্যাপক’ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর এর ‘আংশিক প্রভাব’ পড়বে।
এলমস জানান, কানাডা সম্ভবত ‘আপাতত এই পথেই থাকবে’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ মোকাবিলায় তাদের ব্যবসায়িক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো পুনর্বিন্যাস করবে।
তিনি আরও যোগ করেন, “সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে কী লাগবে। এই আদেশগুলোর ভাষা কিন্তু আলোচনার টেবিলে ফেরার পরিবেশ তৈরির জন্য মোটেও সহায়ক নয়।”
কানাডার যেসব পণ্য নিষিদ্ধ করেছে হোয়াইট হাউজ
হুই-এর মতো দুগ্ধজাত পণ্য, আখের গুড়, অ্যালকোহলমুক্ত বিয়ার , ওয়াইন, রাম ও ভদকা, মল্ট থেকে তৈরি বিয়ার এবং মোপেডসহ বিভিন্ন মোটরসাইকেল।
যেসব পণ্যে উচ্চ হারে আমদানি কর আরোপ করেছে
বিভিন্ন ধরনের পনির, পশুর কাঁচা চামড়া, কাগজ, কিছু আসবাবপত্র ও জ্যাজিম/ম্যাট্রেস, অ্যালুমিনিয়াম ও লোহাসহ কিছু ধাতু, মোটর বোট, গলফ কার্ট, মাছ ধরার ছিপের অংশ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম, সুইচবোর্ড।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার এই উত্তেজনা শুধু শুল্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত মাসে ট্রাম্প ‘লেক অন্টারিও’-র নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার নির্দেশ দেন। এতে কানাডীয়দের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অনেকের মধ্যেই চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রাইজিংবিডি