বুধবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৬

গাজী নজরুল এমপি আছেন, এমপি নেই

সোনার দেশ ডেস্ক ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৩৪ অপরাহ্ন রাজনীতি
সোনার দেশ ডেস্ক ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৩৪ অপরাহ্ন
গাজী নজরুল এমপি আছেন, এমপি নেই
গাজী নজরুল এমপি আছেন, এমপি নেই

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এখনও এমপি আছেন কি না—সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। কেননা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলাম আইনত এখনও সংসদ সদস্য থাকলেও, এখানে নৈতিকতার প্রশ্নটি মূল হয়ে সামনে আসছে। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বাকি ২৪৮ জনের মতো পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু সংসদ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে তিনি তার নির্বাচনি এলাকায় এমপি হিসেবে কোনো কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন না; বরং তিনি ঢাকাতেই অবস্থান করছেন।



গত ২০ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনও তিনি সংসদে উপস্থিত হননি এবং ভোট দেননি। অথচ তিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই জামায়াত মনোনীত প্রার্থীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। সংসদে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও এখনও প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রশ্ন করছেন—যেগুলো সংসদের নিয়ম অনুযায়ী লিপিবদ্ধ হচ্ছে। তার মানে তিনি সংসদে আছেন, আবার নেই। সর্বশেষ সোমবার সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের সুপারিশে জাতীয় সংসদের একটি সংসদীয় কমিটি থেকেও তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে এখন যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো—গাজী নজরুল আইনত সংসদে থাকলেও নৈতিকভাবে তিনি আর এমপি আছেন কি না? আইনতই বা তিনি কতদিন এমপি থাকতে পারবেন এবং তার ব্যাপারে সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত?


নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার সুযোগ কতখানি? জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের অভিযোগ উঠলে বা প্রমাণিত হলে জনগণ তার শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে কি না? জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট দল তাকে বহিষ্কার করলেও জনগণ তার ব্যাপারে কোনো রায় দিতে পারে কি না? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে ‘রিকল’ সিস্টেম চালু আছে, বাংলাদেশে কেন সেই ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই—বর্তমানে এরকম নানান প্রশ্ন উঠেছে।


প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসে সামাজিক মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।


সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ‘সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপনের পর এ নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা, দল থেকে তার বহিষ্কার এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতার পরামর্শে তাকে বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।


গাজী নজরুল যে কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, সেটি কোনো ফৌজদারি দণ্ডনীয় অপরাধ নয়; বরং সামাজিক দৃষ্টিতে নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। আবার নারীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেরকম ঘটনা আরও অনেকে করলেও সবার ঘটনার ভিডিও সামনে আসে না বা থাকলেও সেগুলো প্রচার হয় না বলে তাদের নিয়ে আলোচনা হয় না। তাদের নৈতিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। তার মানে গাজী নজরুল যাই করুন না কেন, ভিডিও ভাইরাল না হলে দল হয়তো তাকে বহিষ্কার করত না।


তাছাড়া শুরুর দিকে ওই ভিডিও বানানো বা ভুয়া—এমন দাবিও করা হয়েছিল। কিন্তু যখন প্রমাণিত হলো যে এটি ভুয়া ভিডিও নয়, তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে জামায়াত তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু আইনত তিনি এমপি পদে বহাল আছেন। কারণ যেসব কারণে কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়, তার মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার কোনো কারণ নয়।


সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদে কেউ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা যে দল থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কী হবে, সেটি স্পষ্ট নয়।


এর পটভূমি বুঝতে একটু পেছনে যেতে হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে নতুন রাষ্ট্রের জন্য যখন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তখন খসড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলের বিপক্ষে ভোটদান, দল থেকে পদত্যাগ এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে গণপরিষদে তুমুল বিতর্ক ও বিরোধিতা হয়। খোদ সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটির পাঁচজন সদস্য এই বিধানের বিরোধিতা করেন এবং সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। তারা নোট অব ডিসেন্ট দেন।


প্রবীণ সংসদ সদস্য আছাদুজ্জামান খান তার নোট অব ডিসেন্টে বলেন, দলের ভেতর শত্রুতা কিংবা ঈর্ষার শিকার হয়ে কেউ দল থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন এবং এভাবে তার সংসদ সদস্যপদ চলে গেলে তা হবে সব গণতান্ত্রিক নীতির এবং ভোটারদের অধিকারের চরম পরিপন্থী। তিনি এর ফলে দলের সাধারণ সদস্যরা সর্বোচ্চ নেতাদের তল্পিবাহক (সাবসারভিয়েন্ট) হয়ে উঠতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মোশাররফ হোসেন আখন্দ এবং আবদুল মুন্তাকীম চৌধুরীও অনুরূপ বক্তব্য দেন। হাফেজ হাবীবুর রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল ভোটারদের পছন্দের ব্যক্তির অধিকারকে বানচাল করতে পারে না। কেবল স্বৈরতন্ত্র ও একদলীয় সরকার থাকলেই এ ধরনের বিধান থাকা সম্ভব। এরকম বিতর্কের পর দল থেকে বহিষ্কৃত হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের বিধানটি সংবিধানে যুক্ত করা হয়নি। তখন সংসদ সদস্যপদ বাতিলের জন্য কেবল দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়: ১. কেউ যদি সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন এবং ২. তিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন।


১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর সময় অবশ্য ৭০ অনুচ্ছেদে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে একটি ব্যাখ্যা যুক্ত করে বলা হয়: যদি কোনো সংসদ সদস্য, যে দল তাকে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনীত করেছে, সেই দলের নির্দেশ অমান্য করে— (ক) সংসদে উপস্থিত থেকে ভোটদানে বিরত থাকেন, অথবা (খ) সংসদের কোনো বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তবে তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে গণ্য হবেন। তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ৭০ অনুচ্ছেদে আবারও পরিবর্তন আনা হয় এবং ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।


৭০ অনুচ্ছেদের বাইরে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদেও সংসদ সদস্যপদ বাতিলের আরও কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—যদি উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন, তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হন, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে ২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।


গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের প্রমাণ মিলেও, এই অপরাধে প্রচলিত আদালতে তার বিচার হয়নি। অতএব নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের সুযোগ নেই—এটিই হচ্ছে আইনের বিধান।


তবে এটা ঠিক যে, রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধিদের শাস্তি সব সময় প্রচলিত আদালতে বা প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় না হলেও তারা নানাভাবেই শাস্তি পান। যেমন তাদের সবচেয়ে বড় বিচার হলো জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়া। গাজী নজরুল যে কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, আইনের দৃষ্টিতে সেটি যত ছোট অপরাধই হোক না কেন বা তার সংসদ সদস্যপদ থাকুক কিংবা না থাকুক—জনগণ তাকে আর গ্রহণ করবে না। ভবিষ্যতে তিনি আর ভোট পাবেন না। তার ব্যাপারে মানুষের যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তার ফলে তার পক্ষে সংসদ সদস্য তো বটেই, অন্য কোনো নির্বাচনেও জিতে আসা কঠিন। তাছাড়া কোনো দল ভবিষ্যতে তাকে মনোনয়ন দেবে কি না—তা নিয়েও সন্দেহ আছে। অর্থাৎ তিনি যে আর জনগণের কাছে যেতে পারবেন না বা তাদের কাছে নিজের বা পরিবারের কারও পক্ষেও ভোট চাইতে পারবেন না—সেই নৈতিক অবস্থান যেহেতু তিনি হারিয়েছেন, এর চেয়ে বড় শাস্তি আর হতে পারে না।


রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা, এমনকি হত্যা মামলায় কারাগারে গেলেও মুক্তির পর দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা তাঁদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়। তারা আবারও জনগণের কাছে গিয়ে ভোট চান। অভিযোগ সত্য হলেও সমর্থকরা বিশ্বাস করেন তাঁদের নেতা ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’। কিন্তু যখন কেউ নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তার ছবি বা ভিডিও প্রকাশ পায়, সেটিকে মানুষ খুনের চেয়েও বড় অপরাধ মনে করে এবং তাকে আর গ্রহণ করতে চায় না। ফলে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মাত্রা আইনিবিচারে যত ছোটই হোক না কেন, প্রচলিত আইনে এটি বিচারযোগ্য হোক বা না হোক—তিনি যে সামাজিক ও রাজনৈতিক শাস্তি পাচ্ছেন, এটি একপ্রকার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের চেয়ে কম নয়।


এখন প্রশ্ন হলো, কারও বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের গুরুতর অভিযোগ উঠলে বা প্রমাণ মিললে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করাটাই কি যথেষ্ট, নাকি এমন একটি কাঠামো থাকা দরকার যেখানে নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সংসদের স্পিকার অভিযোগ পর্যালোচনা করে সত্যতা নিশ্চিত হলে তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করতে পারবেন? এরকম একটি বিধান থাকলে সেটির কি অপব্যবহারের সুযোগ আছে? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—যারা আমাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন, তাঁদের শিক্ষা, রুচি ও নীতি-নৈতিকতার মান কেমন? সমাজের সবচেয়ে ভালো মানুষগুলো কি রাজনীতি করেন বা করতে পারেন? কিংবা তারা ভোটে দাঁড়ালে কি পয়সাওয়ালা আর পেশিশক্তিসম্পন্ন প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসতে পারেন? সাধারণ মানুষও কি জনপ্রতিনিধি হিসেবে সমাজের ভালো মানুষদের নির্বাচিত করে বা করতে চায়?


বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন যে দেড়শো সুপারিশ করেছে, সেখানে ‘রিকল’ বা প্রতিনিধি প্রত্যাহারের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। রিকল হচ্ছে এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো নির্বাচনি এলাকার ভোটারগণ নির্ধারিত সংখ্যক স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাঁদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে পদচ্যুত করার জন্য পুনর্র্নিবাচনের উদ্যোগ নিতে পারেন। ধরা যাক, গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের অভিযোগ উঠেছে—তাতে তার দল তাকে বহিষ্কার করুক বা না করুক, ভোটাররাই রিকলের উদ্যোগ নিতে পারতেন। অর্থাৎ এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ তাঁদের প্রতিনিধি সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। রিকল ব্যবস্থায় পুনর্র্নিবাচনের মাধ্যমে পুনরায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই রিকল ব্যবস্থাকে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা এর মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। তারা যেকোনো মন্দ কাজ করার আগে দশবার ভাবতে বাধ্য হয়। এই ব্যবস্থায় জনগণই তাঁদের প্রতিনিধিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে এবং অযোগ্য কোনো জনপ্রতিনিধিকে দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সহজে কোনো প্রতিনিধি অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো কাজ বা অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সাহস করেন না।


যেহেতু বাংলাদেশে এখনও রিকল ব্যবস্থা চালু হয়নি এবং গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি বা তিনি কোনো ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছর দণ্ডিত হননি, অতএব প্রচলিত আইনে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের সুযোগ নেই। বরং এখন হাতে আছে কেবল সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ—যেখানে বলা হয়েছে, সংসদের অনুমতি না নিয়ে কেউ যদি একটানা নব্বই বৈঠক সংসদে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে। যেহেতু গাজী নজরুল ইসলাম দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে সংসদে যাচ্ছেন না, অতএব তার এই অনুপস্থিতি ৯০ দিন অতিক্রম করলে এবং এই সময়ের মধ্যে তিনি তার সংসদে অনুপস্থিতির যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যাখ্যা করে স্পিকারকে চিঠি না দিলে এবং স্পিকার তার চিঠি গ্রহণ না করলে—তার আসন শূন্যের প্রশ্নটি সামনে আসবে।


তার আগ পর্যন্ত গাজী নজরুল এমপি থাকবেন কি থাকবেন না, সেটি নৈতিক প্রশ্ন হিসেবেই বিবেচিত হবে। ৬৭ অনুচ্ছেদেই আরও বলা হয়েছে: কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।


স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৪ সালে ধর্ম ও হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল আওয়ামী লীগ। আইনত তখনও তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের সুযোগ ছিল না; কিন্তু তিনি নিজেই সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। গাজী নজরুল ইসলামের সামনেও এখন এই পথটি খোলা আছে যে, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন। তাছাড়া তিনি যে দল থেকে বা যে দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন, জনগণ যেহেতু শুধু তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে ভোট দেয়নি, বরং তার দল ও প্রতীককেও ভোট দিয়েছে—সুতরাং সেই দল যখন নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে, অতএব তার উচিত সংসদ থেকেও পদত্যাগ করা। অন্যথায় তিনি সংসদে যাবেন না, কিন্তু সংসদের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন—এটি আরেকটি অনৈতিকতার জন্ম দেবে।


তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ