চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮ মাসে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৪৮, গত ২ মাসেই ২৩
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের উজিরপুরে বাড়ির পাশেই পদ্মা নদী। তিন দফা পদ্মার ভাঙনে বাড়িঘর চলে যাওয়ার পর নিঃস্ব হয়ে সাত্তার মোড়ে ভাড়া করা জমিতে অস্থায়ীভাবে বাস করছিলেন সেলিম।
বাড়িঘর খেয়ে নেবার পর এবার তার ছেলে সোহানকেও খেয়ে নিল রাক্ষুসে পদ্মা। এভাবেই কাঁদতে কাঁদতে ঘটনার বর্ণনা করছিলেন সোহানের বাবা সেলিম রেজা।
সেলিম রেজা বলেন, ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর উজিরপুরের সাত্তার মোড় এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে গোসলে নামে তার ছেলে সোহান। একপর্যায়ে তার হাত থেকে একটি প্লাস্টিকের বোতল পানিতে পড়ে গেলে সেটি তুলতে গিয়ে সে গভীর পানিতে তলিয়ে যায়।
বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয়রা নদীতে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর তাকে উদ্ধার করে দ্রুত শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলেও সেদিন কোনো কাজে আসেনি।
এর মাস দুয়েক আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলীমনগর ঘাটে স্কুল ছুটি শেষে ছয় বন্ধু পদ্মা নদীতে গোসল করতে নামে। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর তীব্র স্রোত ও গভীর খাদে তলিয়ে যায় রিফাত আলী (১৬) ও রাসেল আলী (১৭) নামে দুই বন্ধু। তাদের সঙ্গে থাকা অন্য চার বন্ধু কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যায়। একই দিন বিকেলে সদর উপজেলার রেহাইচর এলাকায় মহানন্দা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন আজাইপুর আরামবাগ এলাকার সাকিরুল ইসলাম (৩০)।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই নদীতে চিরতরে তিনটি তাজা প্রাণ হারিয়ে গেলেও সেদিনও ফায়ার সার্ভিসের দলটি ছিল অসহায়। নিহতদের লাশ সাত ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি এবং পরদিন একটি লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ডুবুরি দল। জেলার সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে গত ২৮ আগস্টে সদর উপজেলার দেবিনগর ইউনিয়নের চরচাকলা গ্রামে। এদিন মরা পদ্মায় একে একে পাঁচ শিশু ডুবে মারা যায়। সেদিনও ফায়ারসার্ভিস ছিল অসহায়।
জেলায় কোনো ডুবুরি দল না থাকায় বরং নদীকেন্দ্রিক জনপদটিতে এমন ঘটনা দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি। প্রতিবছর পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদী ঘিরে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। গোসল করতে নেমে, মাছ ধরতে গিয়ে, নৌকায় পারাপারের সময় কিংবা নদীর চরে খেলতে গিয়ে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্ত বয়স্করা ডুবে মারা যাচ্ছেন। এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো সীমিত।
অনুসন্ধান বলছে- গোসল করতে নেমে চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে পানিতে ডুবে ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ১৭শ বর্গকিলোমিটারের ১৮ লাখ ৩৫ হাজার মানুষের এই সীমান্ত জেলায় উদ্ধারকাজের জন্য ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকায় বিপদের সময় স্বজনদের চাতক পাখির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজশাহী থেকে ডুবুরি আসার অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে। উদ্ধারকাজের এই ধীরগতি ও সক্ষমতার অভাব নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলায় অবিলম্বে স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট চালু এবং দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।
গত আগস্টে ডুবে মারা যাওয়া অধিকাংশই স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী। বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিতে এসব নদী-নালা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ভয়াল রূপ ধারণ করে। আর এই সময়ে গোসল করতে নেমে, মাছ ধরতে গিয়ে কিংবা খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় জানুয়ারিতে ছয়, ফেব্রুয়ারিতে এক, মার্চে চার, এপ্রিলে তিন, মে তে পাঁচ, জুনে পাঁচ আর জুলাই ও আগস্টে নদী-নালায় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাণহানি চরম রূপ নেয়। জুলাইয়ে ১১ এবং আগস্টে জেলাজুড়ে রেকর্ড ১২ জন এবং সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ পর্যন্ত দুইজন পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়ে।
সাম্প্রতিক সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগরের চরচাকলা গ্রামে। পদ্মা নদীর শাখা ‘মরা নদী’তে জুমার নামাজের সময় বড়দের অগোচরে গোসল করতে নেমে একে একে পাঁচ শিশু তলিয়ে যায়। এরা সবাই সম্পর্কে মামাতো, ফুপাতো ও চাচাতো বোন। এদের মধ্যে চারজন চরচাকলা সরকারি প্রাথমিক এবং একজন বিদ্যালয়ের চরদেবিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ডুবে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ জনে। আবার জেলার পাঁচটি থানায় নথিভুক্ত অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলার তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনায় মোট ৭০টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা কমে ৪৮টিতে দাঁড়িয়েছে।
প্রাণহানির কারণ :
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর জলপথ ৩৫ কিলোমিটার, মহানন্দা ৯৬ কিলোমিটার, পাগলা ৩৯ কিলোমিটার এবং পুনর্ভবা ১৪ দশমিক ১২ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এছাড়াও ভাঙনের কারণে পদ্মার শাখা উপশাখা ও মরা পদ্মা নামে অসংখ্য নালা বিস্তৃত। এসব নালাগুলোকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে শতশত গর্ত করে রাখা হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে এসব নালার প্রকৃত গভীরতা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। এতে করে বৃষ্টিপাত ও পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে। শুধু জুলাই ও আগস্টেই ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
অন্যদিকে জেলার বেশির ভাগ নদীর ঘাটে নেই কোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নেই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, লাইফ বয়া, লাইফ জ্যাকেট কিংবা জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম। কোথায় নদীর গভীর খাদ, কোথায় তীব্র স্রোত বা ঘূর্ণিপাক রয়েছে। কিন্তু সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আগাম সতর্ক করার কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।
জেলায় নেয় ডুবুরি দল :
নদীতে তলিয়ে যাওয়া স্বজনদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা পরিবারগুলোকে আরও নিঃস্ব করে দিচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মহানন্দা নদীর পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এক শিশুর বাবা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ছেলেটা যখন নদীতে তলিয়ে গেল, আমরা ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলে তারা এসে বলল পানিতে নামার লোক নেই। রাজশাহী থেকে ডুবুরি আসতে তিন-চার ঘণ্টা পার হয়ে গেল। যদি জেলাতেই ডুবুরি থাকত, তবে হয় তো আমার সন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা যেত।
শিবগঞ্জ উপজেলার পনেররশিয়া এলাকার বাসিন্দা দুলাল হোসেন জানান, ১৮ লাখ মানুষের জেলায় ফায়ার সার্ভিস আছে, অথচ নদীতে নামার ডুবুরি নেই। পানিতে মানুষ ডুবে যাওয়ার পর চাতক পাখির মতো রাজশাহীর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের দিকে তাকিয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছু নয়।
একসঙ্গে চার মেধাবী ছাত্রীকে হারিয়ে চরচাকলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, ক্লাসে ১ থেকে ১০ রোলের মধ্যে থাকা শান্ত ও মেধাবী মেয়েদের এই অকাল মৃত্যু পুরো বিদ্যালয়কে বাগরুদ্ধ করে দিয়েছে। সেদিন উদ্ধার অভিযান দেরির কারণেই এতগুলো প্রাণহানি হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মুনিরুজ্জামান মুনির বলেন, জেলায় ফায়ার সার্ভিসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা নেই। এটি খুবই দুঃখজনক। কেউ পানিতে ডুবে গেলে রাজশাহী থেকে ডুবুরি দল এসে উদ্ধারকাজ চালাতে হয়। অনেক সময় তারা আসতে দেরি করে। কিন্তু ততক্ষণে আমাদের সন্তানদের খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হয়। আমাদের দাবি- দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলায় স্থায়ীভাবে ডুবুরি দল নিয়োগ দিতে হবে।
উদ্ধার ব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক শেখ মো. মাহবুবুল ইসলাম জানান, জেলায় স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট চালুর জন্য একটি প্রকল্পের কাজ চলছে, যা অনুমোদন পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডুবুরি পাওয়া যাবে।
পাঁচ শিশুর মারা যাওয়ার দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন ভবিষ্যতে এসব দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় তরুণদের লাইফ-সেভিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবিব বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিত করে সেখানে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, লাল পতাকা, লাইফ বয়া ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সে ধরনের কোনো কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা জেলা প্রশাসকের কোনো দপ্তর করে না।’
জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার জানান, বর্ষায় ভরা নদী-নালায় তীব্র স্রোতে নদীতে বাচ্চাদের গোসলে না পাঠাতে অভিভাবকের সচেতন হতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাঁতার প্রশিক্ষণের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করতে হবে। প্রতিটি নদী-নালা ও জলাশয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মূসা জঙ্গি বলেন, নদীতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা কমাতে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ