ইইউতে কোটা সুবিধা সত্ত্বেও চিনের কাছে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) কোটা সুবিধার পরও চিনের কাছে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ। বাজারটিতে সামগ্রিক মন্দার চেয়েও বেশি ধাক্কা লেগেছে দেশের রপ্তানিতে।
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মোট আয়ের দিক থেকে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং পরিমাণের দিক থেকে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমেছে। এর ফলে বাজার অংশীদারিত্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের গড় দর ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রতি কেজি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরোতে—যা শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যান অফিস ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সাত মাসে ইইউতে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার ইউরোর পণ্য।
গত বছরের একই সময়ে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০১ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার ইউরো। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ১৩.৬৫ শতাংশ।
এই সাত মাসে ইউরোপের সার্বিক পোশাকের বাজার ৫ দশমিক ১০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এই বড় বাজারে শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ চিনের রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অন্যদিকে তৃতীয় রপ্তানিকারক দেশ তুরস্কের ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং চতুর্থ দেশ ভারতের ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ রপ্তানি কমেছে। তবে পঞ্চম স্থানে থাকা ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।
আয়ের পাশাপাশি পরিমাণের (ওজন) হিসাবেও ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে প্রধান রপ্তানিকারক দেশ চিনের ক্ষেত্রে রপ্তানির পরিমাণ ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে তৃতীয় স্থানে থাকা তুরস্কের ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ভারতের ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৭ শতাংশ পরিমাণের দিক থেকে কমেছে।
প্রতি কেজি গড় দামের হিসেবেও ইইউতে পোশাকের দাম সংকুচিত হয়েছে ৩.২৩ শতাংশ। এর মধ্যে দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশের গড় দর কমেছে ৮.৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে শীর্ষ রপ্তানিকারক চিনের দাম কমেছে ২ দশমিক ১৮ শতাংশ। মূল্যের এই প্রতিযোগিতাতেই বাংলাদেশ চিনের কাছে বড় ধাক্কা খেয়েছে—অর্থাৎ বেশি হারে দাম কমিয়েও বাজার ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
অন্যান্য দেশের মধ্যে তুরস্কের পোশাকের গড় দাম ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ভারতের কমেছে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাকের বাজারে সার্বিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং অব্যাহত মন্দার প্রভাবই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েজের প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল। তবে সাম্প্রতিক উপাত্তে আশার আলো দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিন ও ভিয়েতনাম ছাড়া প্রায় সব প্রধান রপ্তানিকারক দেশই যখন তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে, তখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এই মন্দা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে চিন ও ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে ভালো করছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে মন্দা থাকায় চিন ইউরোপের বাজারে মূল্যছাড় দিয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়েছে। অন্যদিকে উন্নত অবকাঠামোর সুবিধায় ভিয়েতনাম বিশ্বজুড়েই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তবে ইউরোপের বাজারে অন্য দেশগুলোর অবস্থাও চ্যালেঞ্জিং। যেখানে ইউরোপের সার্বিক পোশাক আমদানি প্রায় ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ শতাংশের বেশি। স্বস্তির বিষয় হলো, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ব্যবধান ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
আগের মাস রপ্তানি কমার হার যেখানে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে ছিল, সর্বশেষ তা কমে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ঘাটতি প্রায় ৩ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি বিগত মাসের তুলনায় চলতি মাসে বাংলাদেশের সার্বিক তৈরি পোশাক রপ্তানির গতি বেশ ভালো।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জিডিপির পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করলে ধারণা করা যায়, এই মন্দা সাময়িক। ঘাটতি কমার এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী বছরের নাগাদ ইউরোপের বাজার এবং বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আবার আগের ভালো জায়গায় ফিরে আসবে।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ