চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৬ শতাংশ বাড়িতে এডিসের লার্ভা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। এ অবস্থায় দর্শনার্থীদের অবাধ যাতায়াত এবং অনেক রোগীর মশারি ব্যবহার না করায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নতুন করে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ১৭ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং গুরুতর অবস্থায় তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে জেলা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭০ জন ডেঙ্গু রোগী। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জন পুরুষ, ২৯ জন নারী ও সাতজন শিশু।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ১ হাজার ৪১৪ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে বহির্বিভাগে ১ হাজার ৮০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় ৮৪ জনকে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া জেলা হাসপাতালেও একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জের রানীহাটি গ্রামের ২৪ বছর বয়সী আব্দুর রাজ্জাক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে—দুজন রামেক হাসপাতালে, দুজন নিজ বাড়িতে এবং একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে।
ডেঙ্গুর ভয়াবহতার পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়িয়েছে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ে আইইডিসিআরের কীটতাত্ত্বিক জরিপ। পৌর এলাকার ১৫০টি বাড়ি পরীক্ষা করে ৫৪টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ জরিপ করা প্রায় ৩৬ শতাংশ বাড়িতেই এডিসের প্রজননস্থল রয়েছে।
জরিপে মসজিদপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, নিউ ইসলামপুর, উদয় সংঘের মোড় ও চরজোতপ্রতাপসহ বিভিন্ন এলাকায় এডিসের প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছে। এতে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা নয়, বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি এবং অন্যান্য প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সরেজমিনে জেলা হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীদের অনেকেই ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দায় অবস্থান করছেন। রোগীদের সঙ্গে আসা স্বজনদের ভিড়ও রয়েছে।
রোগী দেখতে আসা আসমা খাতুন বলেন, হাসপাতালের বর্তমান পরিবেশে দর্শনার্থীরাও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, রোগী ও দর্শনার্থীদের অনেকেই মশারি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হাসিব বলেন, দর্শনার্থীদের অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে গেলে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ঘন ঘন বৃষ্টিপাতের কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন। পৌরসভার আরমবাগ ও চাঁদলাই এলাকার ডেঙ্গু আক্রান্ত মরিয়ম ও ঝরনা জানান, তিন দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় তাঁদের শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল। বর্তমানে তাঁরা কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পৌরসভা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মশক নিধন, ফগিং, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে।
জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মাহবুব হাসান বলেন, মাঠপর্যায়ের জরিপে বিপুলসংখ্যক বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। তাই শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন অর রশিদ বলেন, রোগীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা, লার্ভার উৎস ধ্বংস এবং স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. মুসা বলেন, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও এডিস মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পৌর এলাকায় আটটি টিম গঠন করে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে ঘন ঘন বৃষ্টিপাতের কারণে কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে।
উল্লেখ্য স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের জরিপ—দুই দিক থেকেই ডেঙ্গু পরিস্থিতির চাপ স্পষ্ট। ফলে মশক নিধনের পাশাপাশি এডিসের প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।