দুয়ারে শারদ উৎসব, শিল্পীর হাতে সাজছে প্রতিমা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। আর মাত্র আটদিন পর অনুষ্ঠিত হবে মহালয়া। মহালয়ার পাঁচদিন পর শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। আর এই উৎসবকে ঘিরে প্রতিমা তৈরিতে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। অভিজ্ঞ হাতের জাদুতে সূক্ষ্মভাবে গড়ে তুলছেন দেব-দেবীকে। দেবী দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী-সরস্বতীসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিমা তৈরি করছেন তারা।
রাজশাহী নগরীর প্রতীমা পল্লীগুলোতে পুরোদস্তুর চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। ফলে দম ফেলার ফুরসত নেই মৃৎশিল্পীদের। দিন-রাত এক করে চলছে নিখুঁত নকশা ফুটিয়ে তোলা, হাত-পায়ের আঙুল অবয়ব দান এবং কাঠামোর ফাটল জোড়া দেয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মহালয়ার দিন যত এগিয়ে আসছে, কাজের চাপ ও দুশ্চিন্তা তত বাড়ছে শিল্পীদের।
সরেজমিনে নগরীর শেখেরচক, গণকপাড়া ও ষষ্ঠিতলা ঘুরে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের কেউ কেউ মাটির কাজ শেষ করেছেন। আবার কেউবা প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত আছেন। শিল্পীরা জানিয়েছেন, এ কাজে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা করে কাটছে তাদের।
প্রতিমা শিল্পীরা বলছেন, আগের চেয়ে কাজ বেড়েছে, আবার খরচও বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় বাড়েনি পারিশ্রমিক। প্রতিমা তৈরির উপকরণের দামও চড়া। উপকরণ হিসেবে এঁটেল মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ, সুতলি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গত বছরের চেয়ে এবার বেশি দাম গুনতে হচ্ছে তাদের।
নগরীর ষষ্ঠিতলা এলাকার প্রতিমা শিল্পী অরুণ কুমার পাল বলেন, ছোট থেকেই প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছি। জীবন-যৌবন সব এর মধ্যেই কেটেছে। দেবী দুর্গা, গণেশ, কার্তিক সবাইকে তৈরি করা রপ্ত করেছি। শুরুতে জীবিকার তাগিদে প্রতিমা তৈরি করলেও পরে ভালোবাসা আর ভালো লাগা থেকেই এ পেশায় থেকে যাওয়া। কারণ এ পেশায় যে মজুরি পাওয়া যায় তা পরিশ্রমের তুলনায় খুবই কম। এছাড়া সব সময় কাজ থাকে না। পুজোর সময় হলেই প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা বাড়ে। বাকি সময় প্রতিমা-শিল্পীদের তেমন কদর থাকে না।
রাজশাহী নগরীর শেখেরচক এলাকার মৃৎশিল্পী কার্তিক চন্দ্র পাল বলেন, গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই কাজের এখন শেষ মুহূর্তের রূপদানের প্রক্রিয়া চলছে। তার অধীনে আরও কয়েকজন সহকারী শিল্পী দিন-রাত কাজ করছেন। মহালয়ার আগেই প্রতিমার মাটির কাজ শেষ করে দ্রুত রঙের কাজ শুরু করতে হবে এবং পরবর্তীতে দেবী দুর্গাকে পোশাক ও অলংকারে সজ্জিত করা হবে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের রাজশাহী মহানগর সভাপতি অচিন্ত্য কুমার বিশ্বাস সান্টু জানান, গত বছর রাজশাহী মহানগরে ৭৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫টিতে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনারের কাছে যাবতীয় তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় প্রতিমা তৈরির স্থান ও মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়েছে যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) পক্ষ থেকেও গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান জানান, প্রতিটি পূজামণ্ডপে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখার পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। প্রতিটি পূজা উদযাপন কমিটিকে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও পর্যাপ্ত নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
পঞ্জিকা অনুসারে, দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন হবে ঘোড়ায় (ঘোটক) এবং প্রত্যাবর্তন বা গমন হবে নৌকায়। আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মাধ্যমে সূচনা হবে দেবীর আবাহন। পরবর্তীতে ১৬ অক্টোবর মহাপঞ্চমী, ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী ও ২০ অক্টোবর মহানবমীর পর ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এই শারদীয় দুর্গোৎসবের।