পোশাকে উৎসবের ছোঁয়া, শেষ মুহূর্তের ভিড়
দুয়ারে চলে এসেছে শারদীয় দুর্গাপূজা; হাতে আর একেবারেই সময় নেই, তাই শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় এখন চূড়ান্ত ব্যস্ততা। দুর্গাপূজাকে ঘিরে রাজশাহী নগরের অলিগলি পেরিয়ে সেই উৎসবের রঙ এখন সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল সাহেব বাজার, নিউমার্কেট আর বড় বড় শপিংমলগুলোতে। সব মিলিয়ে নগরের বিপণিবিতানগুলোতে এখন কেবলই মানুষের ভিড় আর কেনাকাটার কলকাকলি।
পূজার আনন্দ মানেই নতুন পোশাকের ঘ্রাণ। ফলে পূজার কেনাকাটায় পোশাকের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো। আর সেই আনন্দকে রঙিন করতে দিন-রাত এক করে চলছে কেনাকাটা। শুধু একটি পোশাকে তো আর শারদীয় আয়োজন শেষ হয় না; ষষ্ঠী থেকে দশমী প্রতিটি দিনের সকাল আর সন্ধ্যার আলাদা আলাদা হিসাব। অষ্টমীর সকালের অঞ্জলি দেওয়ার স্নিগ্ধ সাজ থেকে শুরু করে নবমীর জমকালো আরতি সবকিছুর সঙ্গেই চাই মানানসই পোশাক।
নগরীর নিউমার্কেট ও সাহেববাজারের কাপড়ের দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। নারীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ি, জামদানি, ঢাকাই বেনারসি, বেনারসি, রাজশাহী সিল্ক, কাঁথা স্টিচ, মসলিন ও কাঞ্জিবরম। পাশাপাশি তরুণীদের নজর কাড়ছে বাহারি ডিজাইনের কুর্তি, আরামদায়ক কো-অর্ড সেট এবং পাকিস্তানি থ্রি-পিস। বন্ধুদের দল বেঁধে দোকানে ঢুকে রঙের মেলবন্ধন খোঁজার দৃশ্যও চোখে পড়ার মতো। কেউ বন্ধুর পোশাক পছন্দ করে দিচ্ছেন, কেউ আবার নিজের জন্য খুঁজছেন উৎসবের উপযোগী নতুন পোশাক। কার সাথে কোন পোশাকের শেড মিলবে, আড্ডায় বসে চলছে সেই নিখুঁত যাচাই-বাছাই।
আরডিএ মার্কেটের শাড়ি ব্যবসায়ী মানিক কর্মকার বলেন, পূজার এই কয়েকটা দিন আমরা অপেক্ষায় থাকি। সপ্তমী আর অষ্টমীর জন্য ঐতিহ্যবাহী লাল-পাড় সাদা শাড়ি ও জামদানির চাহিদা বরাবরের মতোই বেশি। তবে তরুণীরা এবার হালকা রঙের সফট সিল্ক আর ডিজাইনার কুর্তি বেশি খুঁজছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে ক্রেতাদের পা ফেলার জায়গা থাকছে না। বিক্রি ভালো হওয়ায় ক্লান্তি ভুলে ভালো লাগছে। তবে মানুষ অনলাইন থেকে দেখে এসে সেইগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ছেলেদের কেনাকাটায় প্রধান আকর্ষণ বরাবরের মতোই পাঞ্জাবি। সুতি, তসর, কাবুলি পাঞ্জাবি, সিল্ক কিংবা খাদির ওপর সুক্ষ্ম সুতোর কাজ ও জারদৌসি নকশার পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে বেশি। দশমীর বিসর্জনের ধুতি-পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে অষ্টমী সন্ধ্যার ক্যাজুয়াল শার্ট, কোনোটিই বাদ পড়ছে না তালিকা থেকে।
আরডিএ মার্কেটের পাঞ্জাবি বিক্রেতা আকাশ হাসান বলেন, ছেলেদের কেনাকাটায় এবার খাদির ওপর সুক্ষ্ম সুতোর কাজের পাঞ্জাবির চল বেশি। বিশেষ করে তরুণরা হালকা রঙের সেমি-লং পাঞ্জাবি কিনছে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য, আর সন্ধ্যার জন্য ভারী কাজের ডিজাইন। বন্ধুদের দল বেঁধে এসে ম্যাচিং করে পোশাক কেনার প্রবণতা এবার বেশ চোখে পড়ছে। শেষ মুহূর্তের এই বেচাকেনায় দম ফেলার সময় পাচ্ছি না।
তবে পূজার সবচেয়ে বড় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে শিশুদের পোশাকে। বাবা-মায়ের হাত ধরে দোকানে দোকানে ঘুরছে ছোটরা। মেয়েশিশুদের জন্য ফ্রক বা বারবি গাউন, লেহেঙ্গা, লাল-সাদা সহ নানা রঙের শাড়ি, ধুতি কুর্তি, সারারা ও গারারা সেট আর রাজস্থানি ঘাগড়া এবং ছেলেদের জন্য রঙিন কুর্তা, ধুতি পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কাবলি সেট, টি-শার্ট, পোলো টি-শার্ট ও ছোট পাঞ্জাবিতে সাজানো হয়েছে ডিসপ্লেগুলো। শিশুদের মুখের হাসিতেই যেন পূর্ণতা পাচ্ছে পরিবারের উৎসবের প্রস্তুতি।
নগরীর বড় বড় শপিং মল আর অভিজাত শোরুমগুলোতে পা রাখতেই চোখে পড়ে উৎসবের এক জমকালো আবহ। প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে করিডোরজুড়ে নরম আলোর সাজসজ্জা আর হালকা বাদ্যযন্ত্রের সুর এক স্নিগ্ধ অনুভূতি তৈরি করে। কাচের স্বচ্ছ ডিসপ্লেতে নিখুঁতভাবে সাজানো নতুন কালেকশনের পোশাক, চারপাশের বড় বড় শো-উইন্ডোতে ডামির গায়ে ঝুলছে বাহারি সিল্কের শাড়ি, রঙিন কুর্তি আর আভিজাত্যে মোড়া পাঞ্জাবি—যার চকচকে ঔজ্জ্বল্য আটকে রাখছে পথচলতি চোখ। এক তলা থেকে আরেক তলার চলমান সিঁড়িতে শপিং ব্যাগ হাতে পরিবারের সদস্যদের ওঠানামা আর বন্ধুদের প্রাণবন্ত হাসাহাসিতে মলজুড়ে এক জীবন্ত কোলাহল। এছাড়া ট্রায়াল রুমের সামনে একটু ভিড়, কেউ পছন্দ করা জামা দেখতে গেছে আবার কেউ হাতে কিছু জামা নিয়ে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। কেউবা জামা পরে এসে পরিবার কে দেখাচ্ছে, কেউ আবার নিজের সেলফি তুলতে ব্যস্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুস্মিতা সেন বলেন, পূজার প্রতিটি দিনের অনুভূতির সাথে পোশাকের রঙ মেলানো চাই। সপ্তমীর সকালে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে যাওয়ার জন্য হালকা রঙের সুতির কুর্তি নিয়েছি, আর মহাষ্টমীর আরতির জন্য বেছে নিয়েছি একটা ঐতিহ্যবাহী জামদানি। বন্ধুদের পুরো দল মিলে কেনাকাটা করতে এসেছি, যদিও অনেক গরম কিন্তু তাও অনেক মজা হচ্ছে।
চাকুরিজীবী অসীম কুমার বলেন, নিজের জন্য তো একটা পাঞ্জাবি হলেই চলে, কিন্তু বাচ্চাদের কেনাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। মেয়েটার জন্য তার পছন্দের জামা কিনে দিয়েছি, এখন ছেলের কিনাকাটার পালা। বাজারে ভিড় প্রচণ্ড, তবুও বাচ্চাদের মুখের উচ্ছ্বাস দেখলে সব ক্লান্তি মুছে যায়। উৎসব তো আসলে ওদের হাসিতেই পূর্ণতা পায়।