ঘোড়ায় চড়ে আসছেন দেবী দুর্গা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে শুক্রবার। এই দিন অর্থাৎ ‘মহাষষ্ঠী’তে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও পঞ্জিকা অনুযায়ী সোমবার ছিল দেবীর বোধন। বোধন মানে জাগ্রত করা বা জাগানো। বোধন হয় বেল গাছের তলায়। দেবতারাও বেল গাছের তলায় বোধন করেছিলেন, এ গাছের অন্য নাম শ্রীবৃক্ষ। শ্রী অর্থ সম্পদ বা সৌন্দর্য। তাই পুরোহিতরা সম্পদ বা সৌন্দর্য বা সংসারের উন্নতির জন্য, জ্ঞান ভক্তি লাভের জন্য বেল গাছের মূলে দুর্গাপূজার বোধন করেন। বোধনে ঘট স্থাপন করা হয়। ঘট হল হৃদয়ের প্রতীক। ঘটের জলে যেমন প্রতিবিম্ব পড়ে, সেরকম ভক্তের হৃদয়েও মায়ের ভাব বা স্বরূপের ধারণা হয়। সেই ধারণা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি হয়।
দেবী আসার ঘণ্টা বেজে যায় মহালয়ার দিন থেকেই। সনাতন ধর্ম মতে, যা কিছু দুঃখ-কষ্টের বিষয়, যেমন— বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা এসব থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন দেবী দুর্গা। শাস্ত্রকাররা দুর্গা নামের অর্থ করেছেন— দুঃখের দ্বারা যাকে লাভ করা যায়, তিনিই দুর্গা। দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন।
মহালয়াতেই দেবী আগমনের ঘণ্টা বাজে আর বিজয়া দশমী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন। এই দিনটি শেষ হয় মহা-আরতির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয় শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রোববার (১৮ অক্টোবর) দুই দিন মহাসপ্তমী, সোমবার (১৯ অক্টোবর) অষ্টমী, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মহানবমী এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) দশমীর মাধ্যমে বিদায় নেবেন দুর্গা দেবী। এবার দেবী বিদায় নেবেন নৌকায়।
ষষ্ঠী পূজায় বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে ষষ্ঠাধী কল্পারম্ভ, ষষ্ঠীবিহিত পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে মাকে মন্দিরের আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়। পরদিন বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে স্নান করে মন্দিরে স্থাপন করা হবে। ষষ্ঠী পূজা সম্পন্নের মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হয় বলে জানিয়েছেন পুরোহিতরা।
বোধনের পর সাধারণত খুলে দেওয়া হয় মণ্ডপ। এর মাধ্যমে দেবী জেগে ওঠেন আর তাতে দর্শন করা যায় দেবীর। শাস্ত্রমতে মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদানে) দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। একই সঙ্গে দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। এসময় পূজারীরা মায়ের সামনে বসে মায়ের মুখ দর্শন করবেন।
অষ্টমীতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা হবে। এদিন সকালে নগরীর ত্রিনয়নী সংঘে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। অষ্টমীর দিন বিশেষ আকর্ষণ থাকে কুমারী পূজা এবং সন্ধিপূজায়।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীরাম কৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য।
শাস্ত্রমতে, এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।
নির্বাচিত কুমারীকে মহাষ্টমীর দিন ভোরে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তাকে সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে (ষোলো উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি আর দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
নবমীতে মণ্ডপে ভেসে আসে বিষাদের সুর। কারণ দেবী দুর্গার বিদায়ের ঘণ্টা বাজে নবমীতে। এই দিনে আনন্দের মাঝে বিষাদের ছায়াও পড়ে দেবী ভক্তদের মনে। কারণ দেবী দুর্গা দশমীর দিন কৈলাসে ফিরে যাবেন। দশমীর দিন করা হবে প্রতিমা বিসর্জন, অশ্রুশিক্ত চোখে ভক্তরা বিদায় দেবেন দেবী দুর্গাকে।
সনাতন ধর্মমতে, নবমীর পুণ্য তিথিতে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে বিশ্বে শুভ শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন দেবী দুর্গা। নবমী তিথি শুরু হয় সন্ধিপূজা দিয়ে। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট সর্বমোট ৪৮ মিনিটে সন্ধিপূজা হয়। মূলত দেবী চামুণ্ডার পূজা করা হয় এসময়। এ সময়েই দেবী দুর্গার হাতে বধ হয়েছিল মহিষাসুর, আর রাম বধ করেছিলেন রাবণকে। এই দিনই দুর্গাপূজার অন্তিম দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ পরের দিন কেবল বিসর্জনের পর্ব। নবমীর রাতে উৎসবের রাত শেষ হয়। নবমী রাতে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের ঘণ্টা বাজে।
এবার রাজশাহী জেলায় এবার ৩৭১টি মণ্ডপ ও মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। গেল বছরে ৩৩৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজশাহী মহানগরে ৭৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫টিতে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, রাজশাহী জেলায় এবার ৩৭১টি মণ্ডপ ও মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। গেল বছরে ৩৩৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উৎসবমুখর রাখতে প্রতিটি মণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা আছে। এছাড়াও সাদা পোষাকে পুলিশ থাকবে। কেউ যদি নিরাপত্তা বিঘ্নের চেষ্টা করে, তাহলে পুলিশ যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান জানান, প্রতিটি পূজামণ্ডপে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখার পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। প্রতিটি পূজা উদযাপন কমিটিকে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও পর্যাপ্ত নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।