শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬

এক কলেজে তিন অধ্যক্ষ, তিন সভাপতি!

বগুড়া প্রতিনিধি ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
বগুড়া প্রতিনিধি ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০৪ অপরাহ্ন
এক কলেজে তিন অধ্যক্ষ, তিন সভাপতি!

একই কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে তিনজনের নাম, সভাপতির পদেও একাধিক দাবিদার। কোন কমিটি বৈধ, কে পরিচালনা করবেন প্রতিষ্ঠান এবং কার অনুমোদনে চলছে নিয়োগ কার্যক্রম—এমন নানা প্রশ্নে প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজ। 


এরই মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি দাবি, আদালতের আদেশ নিয়ে মতবিরোধ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় কলেজটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সচেতনমহলে।


অধ্যক্ষ পদে তিনজনের মধ্যে মোজাফফর হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কলেজটির অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর অধ্যক্ষের দায়িত্বে আসেন ময়নুল আহসান। যদিও তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলে নিজেকে দাবি করছেন। তবে ময়নুল আহসান অপসারিত না হলেও অদৃশ্য কারণে সংসদ সদস্য ও শিক্ষকদের সুপারিশে জিয়াউল ইসলাম জুয়েল নামের একজন শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।


অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন লিটন কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাঁকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কলেজের সভাপতি পদে নিযুক্ত করা হয় আকিল আহম্মেদকে। অপরদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডিও লেটারের মাধ্যমে সভাপতি বানানো হয়েছে দাবি তুলেছেন শাহজালাল মানিক নামের আরেক ব্যক্তি।


গেল শুক্রবার (৯ অক্টোবর) স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় কলেজটির নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে বিজ্ঞপ্তিটি কার উদ্যোগে বা কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বৈধতা এবং কোন কমিটির অনুমোদনে এটি প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কলেজটির অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন মোজাফফর হোসেন। তিনি পদত্যাগ করার পর দায়িত্বে আসেন ময়নুল আহসান। পরে তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্য ও শিক্ষকদের সুপারিশে জিয়াউল ইসলাম জুয়েলকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে বর্তমানে কে বৈধভাবে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই।


মুঠোফোনের আলাপচারিতায় নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি করে ময়নুল আহসান জানান, কমিটি নিয়ে জটিলতার কারণে প্রায় ছয় মাস ধরে কলেজে যাচ্ছেন না তিনি। এ অবস্থায় কলেজের নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম কীভাবে চলছে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ হচ্ছে কি না এবং অনলাইন ব্যবস্থাপনার পাসওয়ার্ড কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।


অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ নিয়েও চলছে বিরোধ। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন লিটনকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর আকিল আহম্মেদ মমিনকে সভাপতি এবং রবিউল আলম অশ্রুকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য করা হয়।


পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য রবিউল আলম অশ্রুকে সভাপতি এবং আকিল আহম্মেদ মমিনকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য হিসেবে মনোনয়নের জন্য গাবতলী-শাজাহানপুর-৭ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন ডিও লেটার দেন বলে জানা গেছে।


অন্যদিকে, শাহজালাল মানিকও নিজেকে কলেজটির সভাপতি বলে দাবি করছেন। তাঁর দাবি, তাঁকেও সংসদ সদস্য ডিও লেটার দিয়েছেন। সভাপতির পদে একাধিক ব্যক্তির দাবি এবং বারবার কমিটি পরিবর্তনের ঘটনায় কলেজ পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।


কলেজের কমিটি ও নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে বিরোধ গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। একটি পক্ষের দাবি, শাহজালাল মানিকের নেতৃত্বাধীন কমিটির নিয়োগ কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।


সভাপতি পদে দাবিদার আকিল আহম্মেদ মমিন বলেন, বর্তমানে কলেজটিতে তিনটি কমিটি নিজেদের বৈধ বলে দাবি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গঠিত কমিটির বিরুদ্ধে তাঁরা হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।


আকিল আহম্মেদ মমিন আরও বলেন, পরে শাহজালাল মানিককে সভাপতি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজের নামে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি কার উদ্যোগে এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।


তিনি বলেন, বর্তমানে যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, এর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করব। পত্রিকায় প্রতিবাদ জানাব এবং প্রতিবাদ সভা করব। এলাকাবাসী, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও কমিটি এ নিয়োগ মেনে নেবে না। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পেছনে অসাধু উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।


অন্যদিকে, সভাপতি পদে দাবিদার শাহজালাল মানিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকের কলেজে প্রবেশের অনুমতি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সরকারি বিধির কথা উল্লেখ করে শাহজালাল মানিক বলেন, প্রতিষ্ঠান চলাকালে অনুমতি ছাড়া কোনো সাংবাদিক সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না। পরে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলবেন জানিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।


কলেজের কমিটি নিয়ে বিরোধের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জমিদাতা ও স্থানীয়রা। কলেজের জমিদাতা মো. আশরাফ আলী বলেন, কমিটি নিয়ে বিরোধের কারণে কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। একের পর এক কমিটি পরিবর্তনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।


তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, কলেজটি ভালোভাবে চলুক, উন্নত হোক এবং সবদিক থেকে শান্তি ফিরে আসুক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পড়াশোনার পরিবেশ যেন ঠিক থাকে।

কলেজের শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিনও কমিটি নিয়ে বিরোধের কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, বারবার সভাপতি পরিবর্তন এবং আদালতে রিটের ঘটনায় কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।


তিনি বলেন, কলেজটিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী অল্প খরচে পড়াশোনা করে। কমিটি নিয়ে বিরোধ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।


এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজে একটি কমিটির নিয়োগ কার্যক্রম এবং অন্য পক্ষের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


তিনি আরও বলেন, কলেজটির প্রকৃত অবস্থা জানতে গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হবে। দ্রুত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে।


এডহক কমিটির নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, এ ধরনের কমিটির নিয়োগ দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। এডহক কমিটির মূল কাজ হলো দাপ্তরিক কার্যক্রম চালু রাখা, নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।


তাছাড়া কলেজের সভাপতি ও কমিটি নির্ধারণের এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ডের। উপজেলা থেকে পাওয়া প্রস্তাব বোর্ডে পাঠানো হয়। দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজের অচলাবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তদন্ত করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।