বরেন্দ্রে পানি সংকট নিরসনে ১২০৪ কোটি টাকার প্রকল্প
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার। ১৬ জেলার ১২৩টি উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের প্রস্তাব রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নেমে যাওয়ায় শুধু নতুন নলকূপ স্থাপন নয়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর প্রতিবেদনে সুপেয় পানির প্রাপ্যতার বিবেচনায় দেশের ছয়টি অঞ্চলকে সংকটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের অবস্থান দ্বিতীয়। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং বৃষ্টির পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে মাটির নিচে সঞ্চিত না হওয়ায় এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় খাবার পানি সংগ্রহেও ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ। একই সঙ্গে কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির চাহিদা পূরণেও বাড়ছে চাপ।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ চলবে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, বরেন্দ্র অঞ্চলে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছেন ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। বাকি ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এ সুবিধার বাইরে। এ ঘাটতি কমাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৯ হাজার ৭৭৮টি উন্নত ল্যাট্রিন এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য ১২৫টি শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৩৯৪টি কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ইউনিট, ২২ হাজার ১৭৬টি অগভীর নলকূপ এবং সাবমারসিবল পাম্প ও জলাধারসহ ১ হাজার ৩৯৯টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া ৪ হাজার ৮২৯টি গভীর নলকূপ এবং সাবমারসিবল পাম্প ও জলাধারসহ ১ হাজার ১১৩টি গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
পাশাপাশি ১ হাজার ৬৮টি রিংওয়েল, ১ হাজার ৭৯৭টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে ১৬টি পুকুরভিত্তিক বালু পরিস্রাবণ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। এসব অবকাঠামোর মাধ্যমে নিরাপদ পানির উৎস বাড়ানো, স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি কমানো এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট নিরসনে এত বিপুল অর্থের প্রকল্প কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পানির উৎসগুলোর স্থায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনার ওপর। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় গভীর নলকূপ থেকেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া কঠিন হচ্ছে। ফলে নতুন নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে। এ জন্য খাঁড়ি ও পুকুর খনন-পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চল উঁচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের দিকে চলে যায়। তাই খাঁড়িতে আড়াআড়ি বাঁধ বা ক্রসডেম নির্মাণ করে পানি ধরে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে আমন ধান চাষের সময়ও এ অঞ্চলে খরা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যতটা সম্ভব নদীর পানি ব্যবহার করতে হবে। বোরো ধান চাষের শুরুতে পুকুর ও খাঁড়ির পানি কাজে লাগিয়ে পরে প্রয়োজন অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হবে। কোনোভাবেই নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা যাবে না।
অধ্যাপক সারওয়ার জাহান আরও বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বৃষ্টির পানি পরিশোধন করে মাটির নিচে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ভূ-উপরিস্থ পানির সব ধরনের উৎস কাজে লাগানো এবং পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের আওতায় গত ২৬ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আধুনিক ও নিরাপদ জনপদ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এর সামঞ্জস্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখন একনেকের অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের বাস্তবায়নই বলে দেবে, বরেন্দ্র অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে এ উদ্যোগ কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসুত্র : ঢাকা মেইল অনলাইন।