শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

কলার বাম্পার ফলনেও চাষির মুখে হাসি নেই

সোনার দেশ ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৬ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৬ অপরাহ্ন
কলার বাম্পার ফলনেও চাষির মুখে হাসি নেই

সুফল যাচ্ছে কার পকেটে

জয়পুরহাটে কলার বাম্পার ফলন হয়েছে, কিন্তু সেই ফলন চাষিদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, অথচ বাড়েনি ক্রেতা। উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে কলা বিক্রি করে বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লোকসান গুনছেন চাষিরা। ‘শস্য উদ্বৃত্ত’ হিসেবে পরিচিত একটি জেলায় কৃষকের এমন দুর্দশা শুধু বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামার ঘটনা নয়; এটি কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটের পাঁচ উপজেলায় ৭০৫ হেক্টর জমিতে ৩১ হাজার ৮১ মেট্রিক টন কলা উৎপাদিত হয়েছে। মাসখানেক আগেও শবরি বা মানিক জাতের এক কাঁদি কলা ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম নেমেছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। অন্য জাতের কলার দামও কমেছে। অথচ সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ পড়ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বিক্রি থেকে আয় হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ কৃষকের পরিশ্রম, বিনিয়োগ ও ঝুঁকির যথাযথ মূল্য মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে কৃষক যদি চাষে আগ্রহ হারান, তবে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


চাষিদের অভিযোগ, হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কলার দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। জেলার বাইরে থেকে পাইকারি ক্রেতা কম আসায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তারা। তবে ব্যবসায়ীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, ঢাকাসহ প্রধান মোকামগুলোতে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা যে মূল্যপতনের কারণ হতে পারে, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই যুক্তির আড়ালে কোনো অসাধু চক্র কৃষকের অসহায়ত্বকে কাজে লাগাচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কাউকে দায়ী করা যাবে না, আবার অভিযোগ অস্বীকার করলেই বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত ও বাজারের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন।


এ ক্ষেত্রে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। হাটে কলার ক্রয়-বিক্রয়ের দর, আড়তদার ও পাইকারদের কার্যক্রম এবং জেলার বাইরের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে নতুন পাইকারি ক্রেতা আকৃষ্ট করা, বিভিন্ন মোকামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে সম্মিলিত বিপণনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।


পাশাপাশি সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিকল্প বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকেও নজর দিতে হবে। কৃষিপণ্যের দাম কমলেই শুধু অভিযান চালানো নয়, বরং বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যপতনের কারণ শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অন্যথায় আজ কলাচাষিরা লোকসানে পড়ে চাষ ছেড়ে দিলে আগামী দিনে তার প্রভাব পড়বে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোক্তার বাজারেও। বাম্পার ফলনের সার্থকতা তখনই, যখন সেই ফলন কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও জীবিকায় নিরাপত্তা নিয়ে আসে।