সাড়ে ৬ কোটি টাকার ভবন পড়ে আছে
জবাবদিহি কোথায়?
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা। অথচ আজও ভবনটিতে শুরু হয়নি দাপ্তরিক কার্যক্রম। একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত ভবন তালাবদ্ধ পড়ে আছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজ চালাতে হচ্ছে বিকল্প স্থাপনায়। এই চিত্র শুধু অব্যবস্থাপনার নয়, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্নেরও জন্ম দেয়।
শুরুতে সাত তলা ভবনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে অনুমোদন মেলে তিন তলার, কিন্তু বরাদ্দসংকটে নির্মাণ করা হয় মাত্র দুই তলা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে কার্যালয়ের জন্য ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেই কার্যালয়ের প্রধান কর্মকর্তা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের বসার কক্ষই সেখানে নেই। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, প্রয়োজনীয় কক্ষ ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করেই কেন ভবন নির্মাণ শেষ করা হলো? একটি সরকারি ভবন নির্মাণের আগে ব্যবহারকারীদের চাহিদা, নকশা, অনুমোদন ও বরাদ্দের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়?
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বক্তব্য, বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দাবি, ভবনটি এখনো তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং প্রয়োজনীয় নকশাও তাঁদের হাতে নেই। এসব বক্তব্যে দায়িত্ব ও সমন্বয়ের ঘাটতিই সামনে আসে। তবে কাউকে এককভাবে দায়ী করার আগে প্রকল্পের অনুমোদন, সংশোধিত নকশা, অর্থ বরাদ্দ, নির্মাণের শর্ত এবং ভবন হস্তান্তরের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা জরুরি। কোনো পর্যায়ে ত্রুটি হয়ে থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।
সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবন বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু অর্থের অপচয় হচ্ছে না, ভবনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিকল্প স্থাপনায় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে অতিরিক্ত ব্যয় বা প্রশাসনিক অসুবিধা তৈরি হলে তার দায়ও শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হবে। উন্নয়ন মানে শুধু ভবন নির্মাণ নয়; সেই অবকাঠামোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য।
আমরা মনে করি, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনা করে ভবনটি চালুর প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা। প্রয়োজনীয় নকশা ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে কী ধরনের কাজ করলে ভবনটি ব্যবহার উপযোগী হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে নির্মাণ ও হস্তান্তর পর্যন্ত কোথায় সমন্বয়হীনতা বা গাফিলতি ছিল, তা তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সাড়ে ৬ কোটি টাকার ভবন তালাবদ্ধ পড়ে থাকবে, আর কর্মকর্তারা অন্য ভবনে বসে কাজ করবেন—এ দৃশ্য মেনে নেওয়া যায় না। জনগণের অর্থে নির্মিত ভবন জনগণের সেবায় কাজে লাগুক, এটাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।