ছাতিমের সুবাসে হেমন্তের মায়া, অন্য রূপে রাজশাহী
হেমন্তের আগমনে রাজশাহী মহানগরীর রাজপথে ছড়িয়ে পড়ছে ছাতিম ফুলের সুবাস। আধুনিক নগরায়ণের ভিড়ে দেশীয় জাতের এই বৃক্ষরোপণের সুফল এখন সরাসরি পাচ্ছেন পথচারি ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দিনের বেলায় ঘন সবুজ পাতার ছায়ায় পথচারীদের রোদ থেকে যেমন রক্ষা করছে এই গাছ, তেমনি সন্ধ্যা নামতেই ফুলের ঘ্রাণে চারপাশের পুরো পরিবেশ সুরভিত হয়ে উঠছে।
সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে ছাতিম ফুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন: ‘অপু বলিল, কী ফুলের গন্ধ বেরুচ্ছে, দিদি? তাহাদের মা বলিল, তাহাদের জ্যেঠামশায়ের ভিটার পিছনে ছাতিম গাছ আছে, সেই ফুলের গন্ধ। তাহার পর সকলে গিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। রাত্রি গভীর হয়। ছাতিম ফুলের উগ্র সুবাসে হেমন্তের আঁচলাগা শিশিরাদ্র নৈশবায়ু ভরিয়া যায়। মধ্যরাতে বেনুবনশীর্ষে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের ম্লান জ্যোৎস্না উঠিয়া শিশিরসিক্ত গাছপালার ডালে পাতায় চিকচিক করছে।’
রাজশাহী নগরীর রেলগেট থেকে সিঅ্যান্ডবি মোড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের ফুটপাতজুড়ে সারি সারি ছাতিমগাছের দেখা মেলে। এছাড়াও শ্রীরামপুর জেলা প্রশাসকের বাংলোর সামনের সড়কের দুই ধারে, সিপাইপাড়া জেলখানার পিছনের সড়কের ফুটপাত, উপশহর, সপুরাসহ বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতে এসব ছাতিম গাছ লাগানো হয়েছে। শুধু রেলগেট থেকে সিঅ্যান্ডবি মোড় পর্যন্ত তিন কিলোমিটার সড়কের দুপাশের ফুটপাতে লাগানো হয়েছে ৩৫০টি ছাতিম গাছ।
অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই সাধারণত ছাতিম গাছে কুঁড়ি আসতে শুরু করে এবং ফুল ফুটলে দূর পর্যন্ত এর সুবাস টের পাওয়া যায়। কাজ শেষে বাড়ি ফেরা মানুষ কিংবা সান্ধ্যকালীন নিয়মিত পথচারীরা ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় এই প্রাকৃতিক পরিবেশের ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করছেন।
ছাতিম ফুল সাধারণত শরৎকালের শেষভাগ থেকে হেমন্তকালে বিশেষ করে অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসজুড়ে ফোটে। সান্ধ্যকালীন হাঁটার জন্য রেলগেট সংলগ্ন ফুটপাত নিয়মিত ব্যবহার করেন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর কবির । তিনি জানান, বয়সের কারণে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাকে চিকিৎসকের পরামর্শে হাঁটতে হয়। আগে ধুলোবালি আর গাড়ির শব্দের কারণে ফুটপাতে হাঁটাটা খুব অস্বস্তিকর মনে হতো। এখন এই ছাতিম ফুলের সুবাসের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে মানসিক এক ধরনের প্রশান্তি পাওয়া যায়। প্রতিদিনের হাঁটার এই সময়টা এখন আর ক্লান্তিকর লাগে না।
ছাতিমগাছের গুরুত্ব শুধু ফুলের সুবাসে সীমাবদ্ধ নয়। সড়কের পাশে গাছগুলো ছায়াও দিচ্ছে। সিঅ্যান্ডবি মোড়ে ছাতিমগাছের নিচে ডাব বিক্রি করেন হাসান আলী। তিনি জানান, রোদ থেকে বাঁচতে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ডাব বিক্রি করেন। এতে ডাব গরম হওয়া থেকেও রক্ষা পায়। এবং মানুষও চলাচলের সময় রোদ থেকে বাঁচতে এসে দাড়িয়ে থাকে।
একইভাবে ছাতিমগাছের ছায়া কাজে লাগাচ্ছেন ফুটপাতের অন্য ব্যবসায়ীরাও। সবজি বিক্রেতা শিহাব আহমেদ জানান, গাছের নিচে বসে তিনি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত সবজি বিক্রি করেন। রোদে কাঁচা সবজি শুকিয়ে যায় বলে গাছের ছায়া তাঁর কাজে সুবিধা করে দিয়েছে। এছাড়া মাছ বিক্রেতা দেরও ভালো হচ্ছে। রাজশাহীর এই গরমে ছাতিম গাছ যেন আমাদের কাছে শান্তির জায়গা।
হেমন্তে ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ছাতিমগাছের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহীর বিভিন্ন সড়কে। গাছের ছায়ায় স্বস্তি পান ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা, আর সন্ধ্যার সুবাস উপভোগ করেন পথচারী ও নগরবাসী। পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং নগরজীবনে গাছের ব্যবহারিক গুরুত্ব দুই দিকই উঠে এসেছে রাজশাহীর ছাতিমগাছকে ঘিরে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিবেশ শাখা প্রধান ও পরিবেশ উন্নয়ন কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ উল ইসলাম জানান, অক্টোবর মাসের শুরু থেকে ছাতিম গাছে ফুল আসতে থাকে। ছাতিম গাছ দ্রুত বর্ধনশীল। তীব্র রোদে মানুষকে ছায়া দেয়। আবার এ সময় এর মিষ্টি গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফুল ঝরে যাওয়ার পর এর বীজ সংগ্রহ করা হয়। পরে বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা হয়।