পুশ ইন : কলকাতা হাইকোর্ট
আদালতের নির্দেশনা মানবে ভারত?
বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনি (বিএসএফ) কর্তৃক ‘পুশ ইন’ বা বলপ্রয়োগ করে মানুষ ঢুকিয়ে দেয়ার প্রবণতা নিয়মিত। এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন সীমান্তে এমন ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। কিন্তু বিষয়টি একেবারেই একতরফা। যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে আটক করলে তার পরিচয় যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সীমান্তে বলপ্রয়োগ বা পুশ ইনের মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেরও লঙ্ঘন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুশ ইনের জন্য মনোনিত ব্যক্তিরা যদি বাংলাদেশি হয়েও থাকে, তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রমাণ উপস্থাপনের দায় সম্পূর্ণ ভারতের। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ভারত যদি কাউকে ফেরত পাঠাতে চায়, তবে স্বীকৃত পারাপার কেন্দ্র, ইমিগ্রেশন ও বৈধ প্রবেশপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু ভারত আইনের বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই প্রবণতা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য মোটেও সহায়ক নয়। অথচ বিষয়টি স্পর্শকাতর ও মানবিক।
এমনই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্ট এক তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কাউকে বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করে বহিষ্কার করার পূর্বে তার নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আইনসম্মত, সুস্পষ্ট ও যথাযথ সুযোগ দেয়া বাধ্যতামূলক। কেবলমাত্র প্রতিবেশীদের সন্দেহ বা দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তিকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানো যাবে না। এক রিট আবেদনের শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক বাসিন্দাকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে শুনানিতে এই মন্তব্য করা হয়। আবেদনকারীর আইনজীবী বলেন, কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট তদন্ত ছাড়াই কেবল কয়েকজন প্রতিবেশীর মৌখিক বক্তব্য ও সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে তার মক্কেলকে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে হেফাজতে রাখা হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই ব্যক্তিকে নিজের নাগরিকত্বের সপক্ষে কোনো প্রকার নথিপত্র পেশের বা বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি।
হাইকোর্টের এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব নির্ধারণের মতো জটিল বিষয়ে প্রশাসনকে সর্বদাই একটি ‘সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ প্রক্রিয়া’ মেনে চলতে হবে, নতুবা সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, এতোদিন বিএসএফ কর্তৃক যে সব পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছে তা আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হয় নি। হাইকোর্টের দেয়া স্পষ্ট নির্দেশনার পর পুশ ইনের ব্যাপারে ভারত অধিক সতর্ক হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে সেটাই প্রত্যাশিত।