বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

গ্যাসের বাজারে নৈরাজ্য

সোনার দেশ ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪২ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪২ অপরাহ্ন
গ্যাসের বাজারে নৈরাজ্য

ভোক্তার রান্নাঘরে বাড়তি চাপ


রান্নার গ্যাস মানুষের বিলাসিতা নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। অথচ এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে রাজশাহীর বহু পরিবার এখন রান্নার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এক মাস আগেও যে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৫০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটির জন্য এখন গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও বাজারে সেই দামে গ্যাস মিলছে না বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। প্রশ্ন হলো, সরকার দাম নির্ধারণ করবে, অথচ সেই দামে পণ্য পাওয়া যাবে না—এ কেমন বাজারব্যবস্থা? সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনকে জিম্মি করে এভাবে বাড়তি অর্থ আদায়ের সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


রাজশাহীর জেসমিন আলম কিংবা জোনায়েদ আহমেদের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ভোক্তার অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। পছন্দের ব্র্যান্ডের গ্যাস না পেয়ে কেউ বাড়তি দামে অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার কিনছেন, আবার কেউ অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা এড়াতে ইলেকট্রিক চুলায় ঝুঁকছেন। সাত থেকে আট হাজার টাকা খরচ করে নতুন রান্নার সরঞ্জাম কেনা অনেক পরিবারের জন্য সামান্য বিষয় নয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে এটি নতুন আর্থিক চাপ। রান্নার জ্বালানির সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে যদি সংসারের অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়, তবে তা নিছক বাজারের সমস্যা থাকে না; হয়ে ওঠে জীবনযাত্রার সংকট। ইলেকট্রিক চুলার বিক্রি বাড়ছে—এটিকে শুধু বিকল্প প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে রয়েছে বাড়তি ব্যয়, সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও ভোক্তার বাধ্যবাধকতা।


এলপিজির দাম বাড়ার সঙ্গে সরবরাহ সংকট যুক্ত হলে বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অভিযোগ, কিছু ডিলার সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন এবং খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ সেই সুযোগে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে-কলমে থাকলে ভোক্তার কোনো লাভ নেই। দাম নির্ধারণের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার মজুত যাচাই, বিক্রয়মূল্য তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; বাজারে নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


বিকল্প জ্বালানির দিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ছে, কিন্তু বিদ্যুৎচালিত চুলা সবার জন্য সমান সাশ্রয়ী—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। নতুন চুলা কেনার প্রাথমিক ব্যয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা ও পরিবারের আয় বিবেচনায় বিকল্প ব্যবস্থার সুবিধা সবার জন্য এক রকম হবে না। ফলে এলপিজির সংকটকে কেবল ভোক্তার পছন্দ পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রান্নার জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় বাজার ব্যবস্থাপনারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় কিংবা সরবরাহব্যবস্থার বাস্তব সীমাবদ্ধতা থাকলে তা স্বচ্ছভাবে জনগণকে জানাতে হবে। কিন্তু এসব কারণ দেখিয়ে বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায় বা কৃত্রিম সংকটের সুযোগ দেওয়া যায় না। রাজশাহীর এলপিজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। বাজারের নিয়ন্ত্রণ যদি ব্যবসায়ীদের অনিয়মের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সীমিত আয়ের মানুষ। রান্নার জ্বালানি নিয়ে প্রতিদিনের এই অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে। কারণ, সিলিন্ডারের দাম বাড়ার হিসাব শুধু টাকার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সংসার, স্বস্তি ও ন্যূনতম জীবনযাপনের অধিকার।