‘কালো জাদুর’ অভিযোগে তিন নারীকে নির্যাতন, জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছনা
নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘কালো জাদু’ করার অভিযোগ তুলে একই পরিবারের তিন নারীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন, গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত এবং জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ৫ অক্টোবর গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে সামাজিক লোকলজ্জা, হুমকি ও আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
নির্যাতনের শিকার তিন নারী হলেন প্রবাসী পিন্টু আলীর স্ত্রী বুলবুলি খাতুন, তার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে তিশা খাতুন এবং মা জুলেখা খাতুন (৫০)। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় যুবদলকর্মী জিয়ারুল ও তার ভাই ইয়ারুল সরদারসহ তাদের স্বজনেরা এ ঘটনায় জড়িত। ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
ভুক্তভোগী বুলবুলি খাতুনের দাবি, তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে থাকেন। এ সুযোগে জিয়ারুল তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়া এবং বাড়ি নির্মাণের সময় মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে তা না দেওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি স্বামীকে জানানোর পর স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে তা মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জিয়ারুল ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ বুলবুলির।
বুলবুলি জানান, গত ৫ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে জিয়ারুল, তার ভাই ইয়ারুল ও তাদের স্বজনেরা বাড়িতে এক কবিরাজকে নিয়ে আসেন। ওই কবিরাজ নববধূ ঐশির অসুস্থতার জন্য তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘কুফরি কালাম’ বা কালো জাদু করার অভিযোগ তোলেন বলে দাবি করেন তিনি। এরপর ১৫-২০ জনের একটি দল তাদের বাড়িতে ঢুকে প্রথমে তার বৃদ্ধ বাবা সালামতকে মারধর করে। পরে বুলবুলি, তিশা ও জুলেখাকে তুলে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। তাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতেও স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেছেন বুলবুলি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ইয়ারুল সরদার। তার দাবি, বুলবুলির মেয়ে তিশার সঙ্গে তার জামাতা রাতুল মণ্ডলের বিয়ের প্রস্তাব ছিল। পরে রাতুল অন্যত্র বিয়ে করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিশার পরিবার তাঁর মেয়ে ঐশির ক্ষতি করার জন্য কালো জাদু করেছে বলে তিনি সন্দেহ করেন। ঐশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে বাঁচানোর জন্য কবিরাজ ডেকেছিলেন বলে দাবি করেন ইয়ারুল। তার ভাষ্য, পাড়ার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে তিন নারীকে ধরে এনে নির্যাতন করেছে। তবে জুতার মালা কারা পরিয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন। এ ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানান তিনি। বরং নিজের মেয়ের ক্ষতির অভিযোগে তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সালামত প্রামাণিক জানান, ওই দিন সকালে ১৫-২০ জন লোক লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পিন্টু আলীর বাড়িতে প্রবেশ করেন। তাদের পরিচয় ও আসার কারণ জানতে চাইলে তারা তার সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। স্থানীয় আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার হাফেজ মাওলানা বাইজিদ হোসেন বলেন, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা জরুরি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। আবার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাউকে নির্যাতন বা অপমান করাও গ্রহণযোগ্য নয়। বিচার হতে হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার হাতে নয়। গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন তিনি থানার বাইরে ছিলেন। পরে থানায় এসে জানতে পারেন, ৬ অক্টোবর ভুক্তভোগী বুলবুলি খাতুনের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। নিয়ম অনুসরণ করে সেটি নাটোর আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানও জিডি করে তা আদালতে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, গাড়িষাপাড়ায় তিন নারীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধের আওতাভুক্ত হওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবারটির সঙ্গে দেখা করে তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করবেন।