নিখোঁজের নয় বছর পর হাসপাতালে মেয়েকে জড়িয়ে মায়ের আর্তনাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০১৬ সালে নিখোঁজ হয়েছিলেন পারভীন বেগম (৪৮)। নয় বছরে খোঁজ মেলেনি তার। দিন যেতে যেতে পারভীনকে খুঁজে পাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে স্বজনরা। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আশা ছেড়ে দেয় তারা। ধরেই নিয়েছিলো মারা গেছে পারভীন। তবে নয় বছর পরে- হাসপাতালে মেয়ের সঙ্গে মায়ের দেখা হলে ঘটে এক হৃদয়বিদায়ক মুহূর্ত। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পারভীনের মা জুবেদা বেগম (৭০) বলেন, ‘ধরে নিয়েছিলাম মেয়ে (পারভীন) মারা গেছে। তাই কান্নাকাটি করে মনকে বুজ দিয়েছিলাম। ভেবে নিয়েছিলাম, মেয়ের সঙ্গে কোনদিন দেখা হবে না। কিন্তু ১৫ দিন আগে মোবাইল ফোনের মধ্যে পারভীনের ছবি দেখতে পাই। জানতে পারি মেয়ে রাজশাহী হাসপাতালে আছে। তারপরে মোবাইল ফোনে (ভিডিও কলে) কথা বলি। পারভীন আমাকে দেখে চিনতে পারে। আমাকে বলে- মা ভাত খাচিস (খেয়েছিস)। মেয়ের কথা শুনে বুক ফেটে চোখে পানি চলে আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু আসতে পরিনি। আমার স্বামী নেই। কষ্ট থাকি। গুছানো টাকা নেই। মানুষ দেয়; আর বয়স্কভাতার টাকায় চলি। বয়স হয়েছে আর কাজ করতে পারি না। তিন মেয়ের মধ্যে পারভীন বড়। মেয়ে নিয়ে গিয়ে মানুষের দুয়ারে চেয়ে এনে খাওয়াব। আমি অনেক খুশি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আল্লাহ নয় বছর পর আমার বুকের ধন ফিরিয়ে দিয়েছে। হাসপাতালের সবাইর জন্য দোয়া করি।’
জানা গেছে- পারভীনের বাড়ি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার গাজীপুর গ্রামে। তার বাবা আফতাব হোসেন। সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ রামেক হাসপাতালে পারভীনকে নিতে রামেক হাসপাতালে এসেছেন মামী নাসরিন আক্তার, প্রতিবেশী বেলাল হোসেন ছাড়াও দুই নারী। তারা হাসপাতালের অজ্ঞাত ওয়ার্ডে এসে পারভীনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা একে অপরকে চিনতে পেরেছেন।
পারভীনকে নিতে আসা মামী নাসরিন আক্তার বলেন, নিখোঁজের অনেক দিন হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা ভেবে নিয়েছিলাম পারভীন মারা গেছে। তাকে যে পাওয়া যাবে আমরা কখনও ভাবিনি। তার খোঁজ পাওয়ার পর আমরা প্রথমে বিশ্বাস করিনি। পরে ফেসবুকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি দেখি। এছাড়া হাসপাতাল থেকে যোগাযোগ করলে আমরা নিশ্চিত হয়ে তাকে নিতে এসেছি।
পারভীনের প্রতিবেশী বেলাল হোসন বলেন, প্রায় একমাস আগে শুনতে পেয়েছিলাম পারভীনকে পাওয়া গেছে। সে রাজশাহী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। তার দুইদিন পরে শুনি সে মারা গেছে। রোববার (১৪ সেপ্টম্বর) পারভীনের মা আমাকে এসে বলে রাজশাহীতে যেতে হবে। পারভীন রাজশাহীতে হাসপাতালে আছে। পারভীনের মা খুবই অসহায়। রাজশাহীতে আসার মত টাকা নেই। তাই আমরা এলাকার মানুষের থেকে টাকা তুলে রাজশাহীতে এসেছি পারভীনকে নিতে। আমাদের পাশের গ্রামে পারভীনের বিয়ে হয়েছিল। সংসার জীবনে তার দুই মেয়ে। কিন্তু তারাও খোঁজ খবর নেয় না। এখন বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরে খবর দিলে হয়তো তারা আসবেন।
জানা গেছে- গেল ৩১ জুলাই রাত ১ টা ২৫ মিনিটে পাবনার রূপপুরের সিএনজি স্টেশন এলাকায় অজ্ঞাত নারীকে (পারভীন) দেখতে পান তমাল হোসেন নামের এক মাইক্রোবাস চালক। পরে তিনি একজনের সহযোগিতায় ওই নারীকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেসে ভর্তি করেন। পরিচয় না থাকার কারণে ভর্তি হন ‘অজ্ঞাত’ রোগী হিসেবে। সেখানে থেকে ওই অজ্ঞাত নারীকে প্রথমে পাবনা সদর হাসপাতালে ও পরে রামেক হাসপাতালে রেফার্ড করে চিকিৎসক। তিনি রামেক হাসপাতালের ‘অজ্ঞাত রোগীদের জন্য অস্থায়ী ওয়ার্ড’- এ ৪৫ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন।
অজ্ঞাত নারীকে পাওয়া নিয়ে কথা হয় ঈশ্বদীর তমাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, রূপপুরের সিএনজি স্টেশন এলাকা সড়কের পাসে পড়েছিলেন ওই নারী। তার পুরো শরীরে রক্তাক্ত জখম। আশে-পাশে কেউ ছিল না। তখন ওই নারীকে এক ভাইয়ের সহযোগিতায় ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেসে ভর্তি করা হয়। পরে পাবনার ইয়েলো ল্যাম্প নামের একটি সংগঠন রাজশাহী মেডিকেলে পাঠায়।
অজ্ঞাত রোগীদের নিয়ে কাজ করা ইয়েলো ল্যাম্প এর সভাপতি শহিদুল্লাহ খান উজ্জ্বল বলেন- ‘ওই নারীর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। রক্তাক্ত জখম পুরো শরীরে। তাকে চেনার উপায় ছিল না। রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তির পরে তার শারীরিক উন্নতি হয়েছে। ধারণা ছিল না যে তার এতো দ্রুত শারীরিক উন্নতি হবে। রামেক হাসপাতালে তার মুখে কথা শুনে মনে হচ্ছে- রংপুর, গাইবান্ধা বা দিনাজপুরের মানুষ হতে পারে। কিন্তু বিভিন্নভাবে তার ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি ভালো পরিবারের মানুষ। তার বাম হাতের দুই আঙ্গুলে টিপ সই এর ছাপ রয়েছে। যেগুলো বেশি দিনের না। তার এই আঙ্গুলের টিপ সই-এর ছাপ সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।’
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের ‘অজ্ঞাত রোগীদের জন্য অস্থায়ী ওয়ার্ড’-এ দায়িত্বে থাকা আলেয়া খাতুন বলেন- ‘পুরো শরীরে রক্তাক্ত জখম ছিল। ৪৫ দিন চিকিৎসা দিতে হয়েছে তাকে। এখন মোটামোটি সুস্থ সে। তার পরিচয় ছিল না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত রোগীর ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তকরণে দরখাস্তের মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছিল পুলিশের ফরেনসিক ও সিআইডিতে। তাদের মধ্যেমে জানা যায় তার পরিচয়। তার পরিবার নিতে এসেছে পারভীনকে। আমরা তাদের হাতে তুলে দেব।’
এ বিষয়ে রামেক হাপতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, অজ্ঞাত রোগীদের জন্য অস্থায়ী ওয়ার্ড’এ আরও পাঁচজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। পরিচয় পাওয়ার কারণে আজকে পারভীনকে তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাকে হাপাতাল কর্তৃপক্ষ সবধরনের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছে। আমরা যতটুকু শুনেছি তিনি নয় বছর ধরে নিখোঁজ ছিলেন। দীর্ঘদিন পরে তিনি যে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারছেন এতে আমরা সবাই খুশি।