রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

পাহাড়িয়াদের ছাড়তে হচ্ছে না বসতভিটা, তদন্তের নির্দেশ জেলা প্রশাসনের

WP Import ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫১ অপরাহ্ন
WP Import ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫১ অপরাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী মহানগরীর মোল্লাপাড়ায় ৫৩ বছর ধরে বসবাস করা আদিবাসীদের ছাড়তে হচ্ছে না বসতভিটা। তাদের উচ্ছেদ বিষয়টি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে বসবাসরত পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের আশ^স্ত করা হয়েছে, এই বসতভিটা ছাড়তে হবে না।
৫৩ বছর ধরে পাহাড়িয়ারা ১৬ কাঠা জমিতে বসবাস করে আসছেন। এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ আলী এতদিন পর এই জমির মালিকানা দাবি করছেন। তার চাপে তিনটি পরিবার জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। এখানে তিন প্রজন্মের ১৬টি পরিবার বাস করে। পাহাড়িয়াদের এই ভিটা থেকে তুলে দিতে সাজ্জাদ আলী শুক্রবার ভোজের আয়োজন করে। তাদের খাসি জবাই করে খাওয়াতেন তিনি। তবে পুলিশ সেই ভোজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার দৈনিক সোনার দেশে ‘৫৩ বছর পর ১৬টি পাহাড়িয়া পরিবারকে ছাড়তে হচ্ছে বসতভিটা’ সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ-প্রশাসন। সেখানে পরিদর্শন করেন কাশিয়াডাঙ্গা থানার ওসি আজিজুল বারী। তিনি সাজ্জাদ আলীকেও ফোন করে ডেকে আনেন। এ সময় বিভিন্ন মানবাধিকার ও আদিবাসী সংগঠনের নেতারাও সেখানে আসেন।

সেখানে ছিলেন সাজ্জাদ আলীর কেয়ারটেকার শাহীন। ওসি আজিজুল বারী সাজ্জাদকে কয়েকবার ফোন করান তাকে দিয়ে। একপর্যায়ে একটি দলিল হাতে আসেন সাজ্জাদ। তিনি দাবি করেন, এই জায়গা তিনি ১৯৯৪ সালে কিনেছেন। পুনর্বাসন করে জায়গা দখলে নিচ্ছেন। এলাকার বাসিন্দা আসাদ আলীও এসেছিলেন। পুলিশের সামনেই বললেন, ‘এখানে এরা ৬২ বছর ধরে বাস করছে। এই জমির মালিক ইন্দ্রা ধোপা। সাজ্জাদের কথা আমরা শুনিনি।’

ওসি আজিজুল বারী পাহাড়িয়াদের প্রশ্ন করেন- আপনারা কেন থানায় যাননি? জবাবে মিল্কি বিশ্বাস বললেন, সাজ্জাদ আলী বলেছেন যে তোমরা যদি বাড়াবাড়ি করো, যেটুকু টাকা দিচ্ছি, সেটাও দিব না। এটার জন্য আমরা কোন জায়গাতে যেতে পারলাম না। আমরা টাকা নিতে বাধ্য হলাম।
বিশনি বিশ্বাস বললেন, ‘এখানে জন্ম জায়গা। আমরা যদি এখানে থাকতে পারি, থাকতে চাই। জন্ম জায়গা ছেড়ে কেউ চলে যেতে চায়? কেহু তো চাই না। কিন্তু আমরা কুনু জাগাতেই যাইনি। আমাদেরকে বুলেছে, তোমরা যুদি হাঁটাহাঁটি করো, তাহিলে কুনু টাকাই পাবা না।’

ওসি আজিজুল বারী জানান, এই বিষয়টি তার কাছে ঢাকা থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি প্রত্যেকটি বাড়ির তালিকা করে নেন। তিনি ১৩টি পরিবার থেকে ১৩ জন এবং সাজ্জাদ আলীকে বিকেল ৫টায় কাশিয়াডাঙ্গা জোনের উপপুলিশ কমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে ডাকেন। ওই সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকেই মোবাইল ফোনে ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে সবকিছু জানান।

পরে ওসি সাংবাদিকদের বলেন, আমি সংবাদমাধ্যমে জেনে এখানে এসেছি। এই বিষয়গুলো নিয়ে তারা কখনও আগে থানায় যাননি। নিউজ হওয়ার পরে আপনারা এসেছেন, আমরাও এসেছি। আমরা সকলে মিলে যেটা সুষ্ঠু সমাধান হয়, সেটা করব। যেটাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে না, সেটা করব। আপাতত এখানকার বাসিন্দারা এভাবেই থাকবেন। জমির কাগজপত্র চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে পাহাড়িয়াদের ওই মহল্লা পরিদর্শনে যান জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি গনেশ মার্ডি, সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজেয়াড়, জুলাই-৩৬ পরিষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ জামাল কাদেরী, মানবাধিকারকর্মী আরিফ ইথার, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমানসহ আরও অনেকে। তারা সবার সঙ্গে কথা বলেন।

এ সময় আদিবাসী নেতা গণেশ মার্ডি বলেন, এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, আমরাও এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। তারা আমাদেরও কিছু জানায়নি। এভাবেই তারা বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, প্রশাসন এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্ত করে যেন ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
জুলাই-৩৬ পরিষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ জামাল কাদেরী বলেন, এই পরিবারগুলো ৫৩ বছর ধরে এখানে বাস করছেন। এরমধ্যে আরএস রেকর্ড হয়েছে। তখন মালিক না হোক, দখলীয় হিসেবেও তো আদিবাসীদের কথা লেখা উচিত ছিল। কিন্তু সেটাও হয়নি।

পাহাড়িয়াদের দাবি, এই জমির মালিক ছিলেন ইন্দ্রা ধুপি নামের একজন ধোপা। মুক্তিযুদ্ধের পর ভারত থেকে ফিরে আসা ছয়টি পাহাড়িয়া পরিবারকে তিনি এখানে বাড়ি করতে দেন। এই জায়গাটি তখন ইন্দ্রা ধুপার বাথান নামে পরিচিত ছিল। ইন্দ্রা ধুপা নিঃসন্তান ছিলেন।
ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, হড়গ্রাম মৌজায় ৫১ নম্বর জে.এল ও ১২৯০ নম্বর দাগে জমিটির পরিমাণ ৩৭ দশমিক ৯৪ শতক। ৪০৫ নম্বর আরএস খতিয়ানে জমিটির মালিক হিসেবে লেখা আছে রাজশাহীর কাজীহাটা এলাকার গাজিয়া রজকিনি ও ময়মনসিংহের কোতয়ালীর মনিতারা রজকিনি।

তবে ১৯৯৪-৯৫ সালে এই জমি খারিজ হয়েছে সাজ্জাদ আলী, সৈয়দ আলী, ইমতিয়াজ ও ফাহামিদার নামে। সাজ্জাদ আলী পুলিশের সামনে যে দলিল হাজির করেন, সেখানে দেখা যায় মধূসুদন দাস, দিলীপ দাস, আমমোক্তার সূর্য কমল দাস ও প্রকাস দাস ও তৃপাল রজকের কাছ থেকে তারা কিনেছেন।
ভূমি অফিসের একজন কর্মকর্তা জানান, আরএস রেকর্ডে গাজিয়া রজকিনি ও মনিতারা রজকিনির কাছ থেকে সাজ্জাদের কাছে সরাসরি দলিল হলে কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু মধূসুদন দাস, দিলীপ দাস, আমমোক্তার সূর্য কমল দাস, প্রকাস দাস ও তৃপাল রজকের নামে জমি কীভাবে হয়েছিল, আগে সেই দলিল দরকার। ওই দলিল না পাওয়া গেলে সাজ্জাদের কাছে থাকা দলিল থাকা প্রশ্নবিদ্ধ। এই দলিল সঠিক কি না, সেটা তদন্ত করে দেখতে হবে।

নগরের বড়কুঠি ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসন তাকে তদন্ত করতে বলেছেন। আমি নিজে দুপুরে গিয়ে তদন্ত করেছি। এরপর বিকেলে বসবাসরত পাহাড়িয়া, আদিবাসী নেতা ও সেখানকার বাসিন্দাদের নিয়ে আমার অফিসে বসেছিলাম। সবার কথা শোনা হয়েছে। জমির বিষয়টি বেশ জটিল মনে হয়েছে। শুধু আরএস দেখলে হচ্ছে না এসএ দেখতে হবে। এটা ১৯৪৭ সাল থেকে দেখতে হবে। আশাকরি কয়েকদিনের মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, মোল্লাপাড়ার এই জায়গাটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডে। রাজশাহীর আমচত্বর-কাশিয়াডাঙ্গা সড়ক সংলগ্ন এই জায়গার দাম এখন কয়েক কোটি টাকা। ৫৩ বছর আগে এখানে প্রথমে ছয়টি পরিবার বাড়ি করার সুযোগ পায়। তিন প্রজন্মে বাড়ি হয় ১৬টি।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের তিন দিন পর একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারি সাজ্জাদ আলী সেখানে যান এবং জানান যে জমির মালিক তিনি। এখন তাদের উঠে যেতে হবে। তারও বছর দুয়েক আগে তিনি এ দাবি তুললে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম দুপক্ষকে নিয়ে বসেছিলেন। পাহাড়িয়াদের দাবি, তখন সাজ্জাদের জলিল দাল বলেছিলেন কাউন্সিলর। আওয়ামী সরকারের পতনের পর নজরুল ইসলাম আত্মগোপনে আছেন। তাই তাঁর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সাজ্জাদ আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, ভয়ভীতি দেখিয়ে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তিনি আরও জমি দখল করেছেন। এটিই তার কৌশল। পাহাড়িয়াদেরও তিনি টাকা দিয়েছেন। প্রথম বাড়ি করা ছয়টি পরিবার ধরে প্রত্যেক বাড়িতে দিয়েছেন ৬ লাখ করে টাকা। ছয় পরিবার এখন বেড়ে হয়েছে ১৬টি। মোট ৩০ লাখ টাকা ১৬ পরিবারে ভাগ হয়েছে। কেউ পেয়েছেন ৫০ হাজার, কেউ এক লাখ, কেউবা ২ লাখ। তা নিয়েই তারা চলে যাচ্ছিলেন।

ইতোমধ্যে তিনটি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বাকি ১৩ পরিবারকে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছিল রোববার। তার আগে শুক্রবার সাজ্জাদ আলী খাসি জবাই করে সবাইকে খাওয়ানোর আয়োজন করেছিলেন। সেখানে আশপাশের লোকজনকেও দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল।