রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

মিছিলে ‘স্লোগান দিয়ে’ গ্রেপ্তার বাকপ্রতিবন্ধী সাইদের জামিন

WP Import ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৩:২৪ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
WP Import ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৩:২৪ অপরাহ্ন


সোনার দেশ ডেস্ক :


গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের পাশে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে ‘স্লোগান দিয়ে’ গ্রেপ্তার হওয়া বাকপ্রতিবন্ধী সাইদ শেখকে জামিন দিয়েছে আদালত।
ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইন জামিনের আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন সাইদের জামিনের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

সাইদের আইনজীবী মোহাম্মদ লিটন মিয়া জানিয়েছেন, বুধবার এই তরুণ কারামুক্ত হবেন বলে আশা করছেন তিনি।
গত ২৪ অগাস্টে ওই মিছিল থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার তিনজনের অপর দুই আসামি হলেন, রাজু আহমেদ ও শেখ মো. শাকিল।

গ্রেপ্তারের পর সাইদসহ তিনজনকে ২৫ অগাস্ট আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন মডেল থানার এসআই মাকসুদুল হাসান। সেখানে তদন্ত কর্মকর্তা সাইদকে বাকপ্রতিবন্ধী হিসেবে তুলে ধরেন। ওইদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পল্টন থানার ওই মামলায় বলা হয়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার পাশাপাশি বড় ধরনের ‘অঘটন’ ঘটাতে আসামিরা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেন এবং সমাবেশ আয়োজনের চেষ্টাও করেন।

২৬ অগাস্ট সাইদের পক্ষে তার আইনজীবী জামিন চেয়ে আবেদন করেন। তারা তাকে প্রতিবন্ধী দাবি করে জামিন চান। শুনানি নিয়ে আদালত আসামির উপস্থিতিতে পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ঠিক করে দেন ২৮ অগাস্ট।
এরই মাঝে ২৭ অগাস্ট তদন্ত কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান সাইদকে প্রতিবন্ধী হিসেবে বিবেচনা না করে তোতলা বা অস্পষ্টভাষী হিসেবে বিবেচনা করার আবেদন করেন।

আবেদনে তিনি বলেন, সাইদকে বাকপ্রতিবন্ধী হিসেবে ২৫ অগাস্ট আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত করে জানা যায়, আসামি প্রকৃতপক্ষে বাক প্রতিবন্ধ নন। প্রতিবন্ধী হিসেবে কোনো দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণও মেলেনি।
আদালত এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শুনানির দিন নির্ধারণ করেন ২৮ অগাস্ট।

ওদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান আদালতে হাজির হন। কারাগার থেকে হাজির করা হয় সাইদকেও।
শুনানিতে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইন আদেশ দেন, সাইদ প্রতিবন্ধী কিনা, সে বিষয়ে জেল কোডের বিধান অনুযায়ী একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা করে ১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে সিনিয়র জেল সুপারকে এ আদেশ দেওয়া হয়।

এদিন শুনানিতে যা হল
এদিন ঢাকার সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাইনি মর্মে আদালতকে সিনিয়র জেল সুপার সুরাইয়া আক্তার জানিয়েছেন।
তবে সাইদের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা জামিন শুনানি করেন।

শুনানিতে আইনজীবী উম্মে হাবিবা আদালতকে বলেন, “সাইদ একজন বাকপ্রতিবন্ধী, কথা বলতে পারে না। বাকপ্রতিবন্ধী মিছিলে স্লোগান দিবে কীভাবে। নিজ হাতে সে ভাতও খেতে পারে না।’
তিনি বলেন, “প্রশাসনকে চিন্তা করতে হবে সে একজন বাকপ্রতিবন্ধী। একজন বাকপ্রতিবন্ধী এতদিন বন্দি থাকতে পারে। আমরা ন্যায়বিচার চায়। তার জামিনের প্রার্থনা করছি।”

রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, “এ আসামি প্রতিবন্ধী না। তোতলা বা অস্পষ্টভাষী। প্রতিবন্ধী আর তোতলা এক না। হাসিনা পালিয়ে গেলেও দোসররা রয়ে গেছে। হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে ২৪ অগাস্ট তারা মিছিল করে। সাইদ প্রতিবন্ধীও না, বাচ্চাও না। আওয়ামী লীগের লোকজন টাকা দিয়ে তাকে মিছিলে এসেছে। মিডিয়ায় স্টেটমেন্ট দিয়ে জানাচ্ছে, সবাই আবার হাসিনাকে চায়।”

তিনি বলেন, “আসামি প্রতিবন্ধী কি না এ সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন আসেনি। প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত তার জামিনের বিরোধিতা করছি।”
এরপর সাইদের আইনজীবী আদালতকে বলেন, “সে প্রতিবন্ধী না হলে তো পুলিশ ধরতে পারতো না।”

দুইপক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত বলেন, “বিষয়টা নিয়ে কিছু বলতে হবে। না হলে মিসগাইড হতে পারে। এ মামলাটা তিনবার আমার কাছে শুনানির জন্য এসেছে। একবারও কিন্তু আমি জামিন রিজেক্ট করিনি মানবিক দিক বিবেচনায়। তদন্ত কর্মকর্তা একটা ভিডিও দেখিয়েছে মিছিলের। আগের একটা ভিডিওতে দেখা গেছে, সে আগের সরকারের (আওয়ামী লীগ) পক্ষে কথা বলেছে। তবে পুরোপুরি স্পষ্ট না। মানবিক দিক বিবেচনায় পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত তার জামিন মঞ্জুর করা হল।”

সাইদের আরেক আইনজীবী মোহাম্মদ লিটন মিয়া জানান, “তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নাই। আশা করছি, আগামীকাল বুধবার সে কারামুক্ত হবে।“”
মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, “২৫ অগাস্ট বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের পাশে রাজু আহমেদ, শেখ মো. শাকিল, সাইদ শেখসহ (বাকপ্রতিবন্ধী) অজ্ঞাতনামা ২০০/২৫০ জন সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কতিপয় সদস্য এবং তাদের অর্থদাতা, পরামর্শদাতা ও নির্দেশদাতারা সরকার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্ন এবং ক্ষতিসাধনের ষড়যন্ত্র, ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড পরিচালনার করার জন্য সমবেত হয়। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।

“সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রচারণায় রাজু আহমেদ, শেখ মো. শাকিল, সাইদ শেখ স্লোগান দিতে থাকে। পুলিশ এই তিন জনকে আটক করলে অন্যরা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। তারা সমবেত হয়ে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী মিছিলে অংশ গ্রহণ করে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও সম্পত্তি বিনষ্টের উদ্যোহহ গ্রহণ করে। দেশের আইন শৃঙ্খলা বিনষ্ট জন্য এবং বড় ধরনের অঘটন ঘটানোর জন্য একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেয় এবং সমাবেশ আয়োজনের চেষ্টা করে। তারা দেশের সার্বভৌমত্বকে আঘাত ও জান-মালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াসে একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের সমর্থক, অর্থদাতা, পরামর্শদাতা ও নির্দেশদাতা হিসেবে সক্রিয়ভাবে দেশ বিরোধী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে।”

দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে সাইদ সবার বড়।
মুন্সিগঞ্জের খাসহাটে বাবা-মায়ের কাছে না থেকে নানি এবং মামার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় থাকত ২২ বছর বয়সী সাইদ। সেখান থেকে কীভাবে গুলিস্তানে এল, তা বুঝতে পারছে না পরিবার। তবে মাঝেমধ্যে একা একা সে অনেক জায়গায় চলে যেত বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

সাইদের মা সুমি বলেন, “ও হাত দিয়ে নিজে ভাত খেতে পারে না। কোনো কাজ নিজে করতে পারে না। দৌড়াতে গেলে পড়ে যায়; কথাও ভালো বোঝা যায় না। ওর মত একটা প্রতিবন্ধী ছেলে জেলে আছে; টেনশন হচ্ছে। কীভাবে কী করতেছে! একদিন জেলেখানায় দেখা করতে গিয়ে শুনেছি, জেলখানায় কিছু খায়নি। আমরা পুরো পরিবার দুশ্চিন্তায় আছি। আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটার মুক্তি চাই।”

তিনি বলেন, “ও মাঝেমধ্যে কাউকে কিছু না বলে এখানে-ওখানে চলে যায়; খুঁজে পাওয়া যায় না। নারায়ণগঞ্জ থেকে কীভাবে ঢাকায় গেল আমরা জানি না। হয়ত এলাকার পোলাপাইনের সঙ্গে চলে গিয়েছিল।”

সাইদের মামা সুমন বলেন, “জন্মের পর থেকে ছেলেটা আমাদের কাছে। বাবা-মায়ের কাছে থাকে না। ডাক্তার বলছে ওকে ছেড়ে দিতে। এতে হয়ত ও একটু স্বাভাবিক হবে। ও প্রতিবন্ধী, রাজনীতি বোঝে না। প্রতিবন্ধী ছেলেটা জেলখানায়। আমরা ওর মুক্তি চাই। যে নিজের কাজটা নিজে করতে পারে না, সে কীভাবে রাজনীতি করবে?”- বিডিনিউজ