শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়, ভবন নির্মাণেও বড় জালিয়াতি: কাগজে দশ, বাস্তবে এগারো তলা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভবন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু তাতে উঠতে পারছেন না মালিকেরা। অভিযোগ উঠেছে, এই ভবন নির্মাণের জন্য যিনি তত্ত্বাবধায়ক সুপারভাইজার ছিলেন, তিনি ফ্ল্যাটের মালিকদের জিম্মি করেছেন। খরচের হিসাব চাওয়ায় তিনি এখন কোনো কাগজপত্রই বের করছেন না। কাগজপত্র না পাওয়ায় নেওয়া যাচ্ছে না বিদ্যুৎ সংযোগ। স্বপ্নের ফ্ল্যাট পড়ে থাকলেও কেউ উঠতেও পারছেন না।
রাজশাহী নগরের সপুরা এলাকায় ‘আব্দুল্লাহ টাওয়ার’ নামের একটি ১১তলা ভবন নির্মাণ করে এমন বেকায়দায় পড়েছেন ১৬ জন ব্যক্তি। তাদের অভিযোগ, তত্ত্বাবধায়ক সুপারভাইজার রফিকুল ইসলাম বাড়তি খরচ দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) অনুমোদন না থাকলেও নিয়ম ভেঙে দশ তলার বদলে এগারো তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এবিষয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিকট সপুরা শাহী জামে মসজিদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও অর্থ আত্মসাৎ এর বিষয়ে ভুক্তভোগী দুজন ফ্ল্যাট মালিক নগরের বোয়ালিয়া থানায় অভিযোগ করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২১ সালের শেষের দিকে ১৭ জন ব্যক্তি একটি জায়গা কিনে ভবনটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এই ১৭ জনের একজন রফিকুল ইসলাম। তিনি আগে একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। তিনিই তত্ত্বাবধায়ক সুপারভাইজার হিসেবে ভবনটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তিনি বলেছিলেন, জমি কেনার পর আর ২২ লাখ টাকা করে দিলে তিনি বসবাসের উপযোগী ফ্ল্যাট হস্তান্তর করবেন। কিন্তু বাড়তি খরচ দেখিয়ে তিনি দফায় দফায় টাকা নিয়েছেন আরও বেশি। কেউ ৩০, কেউ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিলেও ফ্ল্যাটের হস্তান্তর পাননি।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, খরচের হিসাব চাইলে রফিকুল মিটিংয়ে উপস্থিত হয় না এবং হিসাব দেন না। তিনি দাবি করছেন যে, ভবন নির্মাণের জন্য তিনি নিজে থেকে বাড়তি ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এই টাকা তাকে দিতে হবে। এ অবস্থায় শেয়ারহোল্ডাররা একজন বিএসসি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে গিয়ে ভবনটি নির্মাণের প্রাক্কলন করেছেন। তাতে দেখা গেছে, জমি কেনা বাদে প্রত্যেকের ২৪ লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা। সে হিসেবে রফিকুল কোনো টাকা পাবেন না। বরং, তার কাছেই শেয়ারহোল্ডাররা প্রায় দেড় কোটি টাকা পাবেন।
ভবনটির ১৭ মালিকের প্রত্যেকের একটি করে ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা। শুধু আবুল খায়ের সুমন নামের এক ব্যক্তির বিনিয়োগ দ্বিগুণ, তাই তিনি দুটি ফ্ল্যাট পাবেন। সম্প্রতি সুমন এবং ভবনের নির্বাহী কমিটির সভাপতি আনসার আলী মৃধা নগরের বোয়ালিয়া থানায় রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তবে তারা পুলিশের কাছে কোনো প্রতিকার পাননি। মালিকদের অভিযোগ, রফিকুল টাকা দিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করে ফেলছেন।
সুমনের অভিযোগে বলা হয়, কাজ শুরুর সময় প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারকে প্রতিটি ফ্ল্যাট ২২ লাখ টাকায় বসবাসের যোগ্য করে হস্তান্তরের আশ্বাস দিয়েছিলেন রফিকুল। পরবর্তীতে ২২ লাখ টাকার পরেও তিনি টাকা চাইতেই থাকেন। কেউ ৩০ লাখ, কেউ ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। সুমন তার দুটি ফ্ল্যাটের জন্য ৭৯ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরবর্তীতে খরচ কম ধরা পড়লে তিনি টাকা ফেরত চান। তখন দুটি রশিদে গ্রহণ করা ২০ লাখ টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন রফিকুল। তিনি অন্য শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গেও একই প্রতারণা করেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ‘টাকার খরচের হিসাব চাইলে তিনি তা দেন না। গড়িমশি করেন। বর্তমানে শেয়ারহোল্ডাররা তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কাজও শেষ করছেন না। এ অবস্থায় কেউ ফ্ল্যাটে উঠতে পারছেন না।
নির্বাহী কমিটির সভাপতি আনসার আলী মৃধা বলেন, ‘খরচ শেষই হচ্ছে না। একের পর এক খরচ দেখিয়ে রফিকুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ অবস্থায় তাকে বাদ দিয়ে মালিকেরা নিজেরাই ফ্ল্যাটের অবশিষ্ট কাজ শেষ করে উঠে যেতে চাচ্ছেন। কিন্তু রফিকুল ভবনে বাইরের কোনো মিস্ত্রি ঢুকতে দিচ্ছেন না। আবার শেয়ারহোল্ডারদের ভবনের কোনো কাগজপত্রও দিচ্ছেন না। ফলে কেউ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নিতে পারছেন না। আমাদের স্বপ্নের ফ্ল্যাটে এখন ভূত বসবাস করছে। আমরা এ ব্যাপারে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।’
জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বাড়তি ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছি। শেয়ারহোল্ডাররা এ টাকা দিচ্ছেন না। তাই কাউকে ফ্ল্যাটও বুঝিয়ে দিচ্ছি না। বাড়তি খরচ দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয়। তারপরও বিষয়টা নিয়ে কয়েকজন থানায় অভিযোগ করেছেন। এটা পুলিশ দেখবে। এখন আর আমার এই বিষয়ে কিছু করার নেই।’
নিয়ম বহির্ভূতভাবে ১১তলা করার বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, আরডিএর প্ল্যান পাসের ১০তলা ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে ১১তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর আগে সপুরা জামে মসজিদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। এবিষয়টি মসজিদ কমিটির সাথে আপস-মিমাংসা হয়ে গেছে।
নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের বিষয়ে আরডিএর চেয়ারম্যান এস এম তুহিনুর আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। যদি এমনটি ঘটে থাকে, তবে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তবে এ বিষয়ে পুলিশের কিছু করার নেই বলে জানিয়েছেন নগরের বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘অভিযোগগুলো আমি দেখেছি। দুপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমস্যাও জেনেছি। এখানে পুলিশের কিছু করার নেই। আমি ভুক্তভোগীদের রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) স্মরণাপন্ন হতে বলেছি। তারা সমাধান দেবে।’